মেক্সিকোর রাউল হিমেনেজের অশ্রুসিক্ত প্রত্যাবর্তন

মৃত্যুভয়, পিতৃবিয়োগ আর দীর্ঘ লড়াই পেরিয়ে আজতেকার রাতে মেক্সিকোর নায়ক রাউল হিমেনেজ।

 

টুইট ডেস্ক: ফুটবল কখনও কখনও কেবল ৯০ মিনিটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি হয়ে ওঠে মানুষের হার না মানা লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। মেক্সিকোর অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড রাউল হিমেনেজের গল্পও তেমনই এক অনুপ্রেরণার নাম, যেখানে আছে মৃত্যুকে ছুঁয়ে ফিরে আসার সংগ্রাম, পিতাকে হারানোর বেদনা এবং স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য মানসিকতা।

২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনালের বিপক্ষে উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সের জার্সিতে খেলতে নেমে ভয়াবহ চোটে পড়েন হিমেনেজ।

ম্যাচের শুরুতেই আর্সেনালের ডিফেন্ডার ডেভিড লুইসের সঙ্গে সংঘর্ষে মাথার খুলিতে গুরুতর আঘাত পান তিনি।

পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক ছিল যে জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হয়। সেই সময় অনেকেই ধারণা করেছিলেন, হয়তো আর কখনও পেশাদার ফুটবলে ফেরা হবে না মেক্সিকান এই তারকার।

তবে দীর্ঘ পুনর্বাসন, মানসিক দৃঢ়তা এবং কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে ২২৯ দিন পর মাঠে ফিরেছিলেন হিমেনেজ। জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় পেছনে ফেলে আবারও নিজেকে প্রমাণ করার পথে হাঁটতে শুরু করেন তিনি।

কিন্তু চলতি বছরের মার্চে বিশ্বকাপের ঠিক আগে নেমে আসে আরেকটি ব্যক্তিগত শোক। হিমেনেজ হারান তার বাবাকে, যিনি শৈশব থেকে তার ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন। সেই শোক নিয়েই বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখেন ৩৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর ম্যাচে ৬৭তম মিনিটে রবার্তো আলভারাদোর নিখুঁত ক্রসে দুর্দান্ত হেডে গোল করে দলের জয় প্রায় নিশ্চিত করেন হিমেনেজ। গোল করার পর দুই হাত আকাশের দিকে তুলে অশ্রুসজল চোখে প্রয়াত পিতাকে স্মরণ করেন তিনি। মুহূর্তটি কেবল একটি গোল উদযাপন ছিল না; ছিল জীবনযুদ্ধ জিতে ওঠা এক মানুষের আবেগঘন প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।

স্কোরবোর্ডে মেক্সিকো ২-০ গোলের জয় পেলেও হিমেনেজের ব্যক্তিগত জয় ছিল আরও গভীর। এটি ছিল মৃত্যুভয়কে জয় করার গল্প, ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার গল্প এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

জাতীয় দলের হয়ে এই গোলের মাধ্যমে হিমেনেজের আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬-এ। এতে তিনি মেক্সিকোর সাবেক তারকা জ্যারেড বোরহেত্তির সমান অবস্থানে পৌঁছেছেন। দেশটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হাভিয়ের ‘চিচারিতো’ হার্নান্দেজের ৫২ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করতে তার প্রয়োজন আর মাত্র ছয়টি গোল।

আজতেকার সেই অশ্রুভেজা রাত তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের স্মৃতি নয়। এটি এমন এক মানুষের কাহিনি, যিনি ভাঙা খুলির যন্ত্রণা, পিতৃবিয়োগের শোক এবং অনিশ্চয়তার অন্ধকার পেরিয়ে আবারও আলোয় ফিরেছেন।

আর সেই কারণেই রাউল হিমেনেজের এই গোল ফুটবল ইতিহাসে অনুপ্রেরণার এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।