বিশাল বাজেটে বাড়ছে ঘাটতি, রাজস্ব আদায় নিয়ে শঙ্কা

মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ, নিম্নআয়ের মানুষের স্বস্তিই আগামী বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ
টুইট ডেস্ক: ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি, কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা এবং সীমিত আয়ের চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যখন কঠিন হয়ে উঠেছে, তখন বড় আকারের বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৭ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হতে পারে, যেখানে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য এবং রাজস্ব আহরণ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংশয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়নের চেয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজধানীর একটি বস্তিতে বসবাসকারী রহিমা বেগমের জীবনসংগ্রাম যেন দেশের নিম্নআয়ের মানুষের বাস্তব চিত্র। দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন তিনি। সংসারের হাল ধরেছে তার অল্প বয়সী সন্তান। বাজেট নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “গরিব মানুষ যেন সরাসরি সহায়তা পায়। যারা সত্যিকারের অসহায়, তাদের অনেকেই কোনো সহায়তা পায় না।”
বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করায় নিত্যপণ্য ও সেবার ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। এতে দেশের প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি মানুষ অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে অর্থনীতির গতি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস তৈরি করতে হবে।
বিশাল বাজেট, বড় ঘাটতি
প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), ঋণ পরিশোধ, অগ্রিম ও খাদ্য খাতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বাজেটের আকার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে ঘাটতির পরিমাণ। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “রাজস্ব আদায় রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই কোন খাতে ব্যয় সত্যিই জরুরি, সেটি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।”
রাজস্ব আহরণে বড় চ্যালেঞ্জ
আগামী বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা রাখা হচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণ, বৈদেশিক ঋণ এবং অন্যান্য উৎস থেকেও অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর ও ভ্রমণ করের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বে এখনও নিচের দিকেই রয়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেটের প্রত্যাশা
দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের আয় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়লেও মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার আগামী বাজেটকে “অন্তর্ভুক্তিমূলক” এবং “জনবান্ধব” হিসেবে তুলে ধরার কথা বলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হলেও কার্যকর বাস্তবায়ন ও সঠিক নীতিনির্ধারণ ছাড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।






