চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি: ধর্ষণ করেছে ডলার, হত্যা করেছি আমি

আদালতে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি: স্বামী সোহেলের মুখে নির্দোষ দাবি শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বপ্না আক্তার।

বিশেষ প্রতিবেদক: রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তার হত্যা মামলায় আদালতে চাঞ্চল্যকর বক্তব্য দিয়েছেন প্রধান আসামি সোহেল রানা। তিনি দাবি করেছেন, শিশুটিকে ধর্ষণ করেছেন ‘ডলার’ নামে আরেক ব্যক্তি, আর তিনি নিজে শুধু হত্যার সঙ্গে জড়িত।

সোমবার (১ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় এবং বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। শুনানি শেষে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে সাংবাদিকদের উদ্দেশে সোহেল বলেন, “আমি ধর্ষণ করি নাই, বাচ্চারে ধর্ষণ করেছে ডলার। হত্যা করে লাশ টুকরা করেছি আমি।”

শুনানি উপলক্ষে সকাল পৌনে ৮টার দিকে সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। তাদের মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয় এবং পরে এজলাসে তোলা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু অভিযোগ গঠনের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি বলেন, আসামিরা শিশুটিকে বাসায় ডেকে নিয়ে বাথরুমে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। নির্যাতনের একপর্যায়ে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে মৃত ভেবে গলা কেটে এবং শরীরের অংশ বিচ্ছিন্ন করে লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়।

তিনি আরও জানান, ঘটনার দিন সকালে রামিসার মা তাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খুঁজতে গিয়ে মেয়েটিকে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হন। পরে একটি জুতা দেখতে পেয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। অন্য ফ্ল্যাটের দরজা খুললেও আসামিদের দরজা বন্ধ থাকায় সন্দেহ বাড়ে। জানালা দিয়ে রক্ত দেখতে পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, সোহেল পালিয়ে গেছেন এবং স্বপ্না ঘরে উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ আসামিদের অব্যাহতি চেয়ে বলেন, তদন্ত তড়িঘড়ি করে শেষ করা হয়েছে এবং কোনো প্রত্যক্ষদর্শী উপস্থাপন করা হয়নি।

আদালতে কথা বলার অনুমতি না পেলেও পরে সোহেল বলেন, “আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন। আমি পাপ করেছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন।”

তিনি আরও দাবি করেন, “মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল।” এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, তার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়নি এবং প্রকৃত অপরাধী ডলার, যার বাড়ি মিরপুর-১১ নম্বরে।

সোহেল আরও বলেন, “আমার ওয়াইফ আমাকে সাহায্য করেনি। তার কোনো দোষ নাই।”

অপরদিকে স্বপ্না আক্তার আদালতে নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং স্বামীকে উদ্দেশ করে বলেন, “তুমি বলো আমি দোষী কিনা।” সোহেল তাকে নির্দোষ দাবি করেন।

গত ১৯ মে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শিশুটিকে কৌশলে আসামিদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে হত্যা করে মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়।

পুলিশ জানায়, সোহেল হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং হাত-পা আংশিক কেটে ফেলে। মরদেহ বাথরুম থেকে এনে খাটের নিচে রাখা হয় এবং মাথা বালতিতে রাখা হয়। এরপর জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান। স্বপ্না ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

পরে সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানায় পুলিশ।

ঘটনার দিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২৪ মে এসআই অহিদুজ্জামান দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন।

মামলাটি পরে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। আদালত অভিযোগ গঠন করে মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করেছেন।

মামলাটিতে সোহেলের নতুন দাবি, ধর্ষণের জন্য ‘ডলার’ নামের আরেক ব্যক্তিকে দায়ী করা, তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণ, জবানবন্দি এবং সাক্ষ্যই শেষ পর্যন্ত মামলার গতিপথ নির্ধারণ করবে।