বাকলিয়ায় রণক্ষেত্র,পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ১৫ সদস্য আহত

টুইট প্রতিবেদক: ধর্ষণকাণ্ড ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ১৫ সদস্য আহত, পুড়ল ট্রাক।
চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার নজিরবিহীন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
গত ২১ মে রাতভর দফায় দফায় সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন পুলিশ সদস্য। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পুলিশবাহী একটি ট্রাক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিপুল পরিমাণ রাবার বুলেট, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামে এত বড় মাত্রায় শক্তি প্রয়োগের ঘটনা এটিই প্রথম।
মঙ্গলবার রাতে বাকলিয়া থানার চাকতাই পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মোবারক হোসেন দায়ের করা মামলার এজাহারে সংঘর্ষের বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসে।
এজাহার সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লার মুরাদনগরের গাংগাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মনির হোসেন, যিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের মিয়াখান নগরের আলী স্টোর বিল্ডিংয়ে বসবাস করতেন, তিনি বিসমিল্লাহ ম্যানশনের একটি কক্ষে শিশুটিকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খবর পেয়ে ২১ মে বিকেল ৫টা ১২ মিনিটে এসআই মোবারক হোসেন সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে শিশুটিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়।
‘আসামি ছাড়বে না’ স্লোগানে উত্তেজনা
ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন অভিযুক্ত মনির হোসেনকে আটক করে রেখেছিল। পুলিশ তাকে নিজেদের হেফাজতে নিতে চাইলে জনতা বাধা দেয়। একপর্যায়ে “আসামিকে হত্যা করতে হবে” স্লোগানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের অনুরোধ জানানো হয়।
পরে ঘটনাস্থলে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং র্যাব-৭–এর সদস্যরা যোগ দেন। উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মেগাফোনে সতর্কবার্তা দিলেও জনতা ছত্রভঙ্গ হয়নি। এরপর লাঠিচার্জ করা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি আরও সহিংস রূপ নিলে পুলিশ শক্তিশালী ভিড় নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম ব্যবহার শুরু করে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ ৭৬ রাউন্ড রাবার বুলেট, ৩৫ রাউন্ড লং রেঞ্জ টিয়ারশেল, ৩১ রাউন্ড শর্ট রেঞ্জ টিয়ারশেল, ৫টি টিয়ার গ্যাস হ্যান্ড গ্রেনেড, ৫৫টি সাউন্ড গ্রেনেড, ১৬টি ৬-ব্যাং গ্রেনেড এবং ৯টি ৭-ব্যাং গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
আহত পুলিশ, আগুনে পুড়ল ট্রাক
ইটপাটকেলের আঘাতে উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া গুরুতর আহত হন। কনস্টেবল সুজন কান্তি দে মাথায় গুরুতর জখম হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। এছাড়া আরও ১৩ জন পুলিশ সদস্য লাঠি, রড ও অগ্নিদগ্ধসহ বিভিন্ন আঘাতে আহত হন। এজাহারে দাবি করা হয়েছে, এক পুলিশ সদস্যকে আগুনের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
পরিস্থিতির মধ্যে এসআই মোবারক, এসআই মিজানুর রহমান ও এএসআই মোশারফ হোসেন কৌশলে অভিযুক্ত মনির হোসেনকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হন। জানা গেছে, তাকে পুলিশের পোশাক পরিয়েই নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।
তবে অভিযুক্তকে সরিয়ে নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে জনতা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তুলাতলী থেকে রাজাখালী ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। রাত ১০টা ২০ মিনিটে শাহ আমানত সংযোগ সড়কে পুলিশবাহী একটি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া বাকলিয়া থানার ওসির পিকআপ, সহকারী পুলিশ কমিশনারদের দুটি গাড়ি এবং অনন্ত বিলাস কমিউনিটি সেন্টারেও ভাঙচুর চালানো হয়।
ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার ১১
শিশুটির বাবা মেহেদী হাসান বাদী হয়ে মনির হোসেনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পৃথক মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযুক্ত মনির হোসেন পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।






