জলাবদ্ধতায় স্থবির নগরী

ঈদযাত্রা, পশুরহাট ও জনজীবনে চরম ভোগান্তি; আরও তিনদিন বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা

টুইট প্রতিবেদক: রাজধানীতে অল্প সময়ের ভারী বর্ষণে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ঈদযাত্রা, পশুরহাট ও নগরজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। সোমবার দুপুরের প্রবল বর্ষণে ঢাকার বহু সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ঢাকায় ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে মাত্র এক ঘণ্টায় ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, স্বল্প সময়ে এ ধরনের বৃষ্টিপাত মৌসুমের অন্যতম তীব্র বর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আবহাওয়া বিভাগের মানদণ্ড অনুযায়ী, ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতকে ভারী বর্ষণ ধরা হয়। সেই হিসেবে রাজধানীতে সোমবারের বৃষ্টি ছিল উল্লেখযোগ্য মাত্রার। নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, আজিমপুর, কবরস্থান সড়ক, মগবাজার, মধুবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুপানি জমে যায়। অনেক জায়গায় গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে এবং যাত্রীরা পানির মধ্যে নেমে পথ অতিক্রম করতে বাধ্য হন।

ঈদুল আজহা সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, মহাসড়কসংলগ্ন এলাকা এবং পশুরহাটমুখী সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পশুবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার বাস ও ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় নগরজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর অংশেও জলাবদ্ধতার তীব্র প্রভাব দেখা যায়। ভোগড়া বাইপাস, কুনিয়া ও বড়বাড়ি এলাকায় সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। একই ধরনের দুর্ভোগের খবর এসেছে দেশের অন্যান্য মহাসড়ক থেকেও।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বর্ষা আগমনের প্রাক্কালে এমন পরিস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। মে মাসের শেষভাগে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এ সময় কালোমেঘ, বজ্রবৃষ্টি এবং পরক্ষণেই ভ্যাপসা গরম—সবই মৌসুমি বৈশিষ্ট্যের অংশ।

আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, কালবৈশাখী ও বজ্রবৃষ্টির কারণেই অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। আগামী তিনদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা তুলনামূলক কম। বৃষ্টির পর আবারও ভ্যাপসা গরম ফিরে আসতে পারে বলেও জানান তিনি।

ঈদের দিনের আবহাওয়াও বৈচিত্র্যময় হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টি কমে মৃদু তাপপ্রবাহ ও অস্বস্তিকর গরম অব্যাহত থাকতে পারে।

আগামী ২৮ মে বৃহস্পতিবার দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক জায়গায় দমকা হাওয়া, বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণও হতে পারে। রাজধানী ঢাকাসহ দক্ষিণাঞ্চলেও বিচ্ছিন্ন বজ্রবৃষ্টির আভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক বলেন, সাময়িক বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি দিলেও জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত জ্যৈষ্ঠের খরতাপ ও ভ্যাপসা গরম অব্যাহত থাকতে পারে। বৃষ্টির পর বাতাসে জলীয় বাষ্প বেড়ে যাওয়ায় গরমের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

সোমবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানীতে তাপমাত্রা ছিল ৩২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিনে দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে নোয়াখালীর মাইজদী কোর্টে ৯৫ মিলিমিটার। এছাড়া নেত্রকোনা, সিলেট, চাঁদপুর, বগুড়া, নওগাঁ ও ময়মনসিংহেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে ঈদের দিন বাইরে বের হওয়ার সময় ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সকালের দিকে বৃষ্টির তীব্রতা বেশি থাকতে পারে, যা খোলা মাঠে ঈদের জামাত আয়োজনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে নিকটস্থ মসজিদ প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ঈদগাহেও বৃষ্টি প্রতিরোধে বিশেষ শামিয়ানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কোরবানির পশু জবাইয়ের সময় বৃষ্টির পানি ও বর্জ্য একত্রে মিশে পরিবেশ দূষণ এবং নতুন জলাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। তাই সিটি কর্পোরেশন ও পৌর কর্তৃপক্ষকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।