সিগন্যাল ভাঙলেই ডিজিটাল মামলা

আই ক্যামেরায় তিন দিনে ধরা পড়ল আড়াই হাজার আইন লঙ্ঘনের ঘটনা
টুইট ডেস্ক: রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে এখন আর ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেও পার পাওয়া কঠিন। সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলাচল কিংবা হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো সবকিছুই নজরদারিতে রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা। আর সেই ফুটেজের ভিত্তিতেই দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল মামলা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এআই-চালিত সিসিটিভি ক্যামেরা চালু করেছে। গত ৭ মে থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমের প্রথম তিন দিনেই ট্রাফিক আইন ভঙ্গের আড়াই হাজারের বেশি ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে সেগুলো যাচাই-বাছাই করছে ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট (টিটিইউ)। যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট চালক ও গাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল মামলা ও নোটিশ পাঠানো হবে।
ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীর অন্তত ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টে এই প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, রামপুরা, গাবতলী, কাকরাইল, হাইকোর্ট ক্রসিং ও মৎস্য ভবন এলাকায় বসানো হয়েছে আধুনিক এআই সক্ষম ক্যামেরা।
এই ক্যামেরাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না পরা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, অবৈধ পার্কিং ও অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো অপরাধ শনাক্ত করছে।
কারওয়ান বাজার মোড়ে বদলে যাচ্ছে চিত্র
রাজধানীর কারওয়ান বাজার মোড়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, এআই ক্যামেরা চালুর পর চালকদের আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। সিগন্যাল পরিবর্তনের সময় আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হয়ে যানবাহন চালাতে দেখা গেছে অনেককে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে।
দায়িত্বরত ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানান, আগে আইন ভঙ্গকারী গাড়ি থামিয়ে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে সড়কে অতিরিক্ত যানজট তৈরি হতো। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ হওয়ায় ট্রাফিক সদস্যরা যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বেশি মনোযোগ দিতে পারছেন।
কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. সবদুল বলেন, আগে কাগজপত্র যাচাই ও মামলা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগে যেত। এখন ক্যামেরাভিত্তিক নজরদারির ফলে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হচ্ছে এবং যানজটও কিছুটা কমছে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ট্রাফিক সার্জেন্ট সুজয়। তিনি বলেন, কাগজের স্লিপে মামলা দেওয়ার পুরোনো পদ্ধতিতে ভুল ও জটিলতা থাকত। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় সেই সমস্যা কমছে।
চালকদের মধ্যেও বেড়েছে সতর্কতা
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চালকদের মধ্যেও নতুন এই ব্যবস্থার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অনেকেই এখন সিগন্যাল মেনে চলছেন শুধুমাত্র ক্যামেরার ভয়ে।
কারওয়ান বাজার এলাকার প্রাইভেটকার চালক আবদুল করিম বলেন, আগে ট্রাফিক পুলিশ না থাকলে অনেকেই নিয়ম মানতেন না। এখন কোথায় কখন ফুটেজ ধারণ হচ্ছে বোঝা যায় না বলে সবাই সতর্ক হয়ে গেছেন।
বাংলামোটর এলাকায় অপেক্ষমাণ যাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, আগে সিগন্যাল অমান্য করে দ্রুতগতিতে গাড়ি চলাচলের কারণে রাস্তা পার হতে ভয় লাগত। এখন চালকরা তুলনামূলক ধীর ও সতর্কভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন।
প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন ধাপ
ডিএমপি সূত্র জানায়, আগে কাগজের স্লিপে মামলা দেওয়ার পর ‘পয়েন্ট অব সেল’ (পিওএস) মেশিন চালু করা হলেও সড়কে গাড়ি থামিয়ে তাৎক্ষণিক মামলা দেওয়ার কারণে যানজট বাড়ত। সেই সমস্যা সমাধানেই এখন এআই-নির্ভর ডিজিটাল প্রসিকিউশন ব্যবস্থায় যাচ্ছে ট্রাফিক বিভাগ।
এই ব্যবস্থায় ‘রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট-২০১৮ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যার’ ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নম্বর প্লেট শনাক্ত করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে সংশ্লিষ্ট মালিক বা চালকের মোবাইলে খুদেবার্তা পাঠানো হবে এবং ডাকযোগেও নোটিশ পৌঁছে দেওয়া হবে।
চ্যালেঞ্জও রয়েছে
তবে নতুন এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। অনেক যানবাহনের নম্বর প্লেট অস্পষ্ট বা অনুপস্থিত থাকায় সেগুলো শনাক্ত করতে সমস্যা হচ্ছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, নতুন প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ প্রভাব বুঝতে কিছুটা সময় লাগবে। বর্তমানে সার্ভারের সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে সংগৃহীত আড়াই হাজারের বেশি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট।
তিনি আরও জানান, আগামী সাত দিনের মধ্যে আইন লঙ্ঘনকারী চালক ও মালিকদের কাছে এসএমএস এবং ডাকযোগে নোটিশ পাঠানো হবে। একই সঙ্গে খুব শিগগিরই একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে যাতে কোনো যানবাহন নম্বর প্লেট ছাড়া কিংবা অস্পষ্ট নম্বর প্লেট নিয়ে রাজধানীতে চলাচল করতে না পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে, কমবে আইন অমান্যের প্রবণতা এবং দীর্ঘমেয়াদে যানজট নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।






