বাগমারায় মানবপাচার চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার

লিবিয়ায় আটকে পড়া দুই যুবক উদ্ধার, মুক্তিপণে নেওয়া হয় ২০ লাখ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় অপহরণ চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে লিবিয়ায় আটকে পড়া দুই ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, উপজেলার যোগীপাড়া ইউনিয়নের বীরকুৎসা গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক (৪৫) এবং গোপীনাথপুর গ্রামের জিসান (২২) উন্নত জীবনের আশায় দালাল চক্রের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকার চুক্তি করেন। তবে প্রতারক চক্রটি ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে কৌশলে তাদের লিবিয়ায় পাচার করে।

লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তারা একটি সংঘবদ্ধ বাংলাদেশি মানবপাচারকারী চক্রের কবলে পড়েন। সেখানে তাদের অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিশ্রাম থেকেও বঞ্চিত করা হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অপহরণকারীরা ইমো অ্যাপের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। দাবির সমর্থনে নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও পাঠানো হলে পরিবার আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতির চাপে পরিবার জমি বিক্রি এবং উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ২০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে চক্রের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের একটি ব্যাংক হিসাবে পাঠায়। কিন্তু অর্থ পাওয়ার পরও ভুক্তভোগীদের মুক্তি না দিয়ে আরও টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে চক্রটি।

এ ঘটনায় পরিবার বাগমারা থানায় অভিযোগ দায়ের করলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী একটি মামলা রুজু করা হয়।

মামলার তদন্তভার পেয়ে উপপরিদর্শক শিহাব উদ্দীনের নেতৃত্বে একটি দল তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের ভৈরব এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানে লিবিয়াভিত্তিক চক্রের বাংলাদেশি সহযোগী ও ব্যাংক হিসাবধারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ভৈরব উপজেলার শ্রীনগর উত্তরপাড়া গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে আল মামুন (৩৮), মৃত সোনা মিয়ার ছেলে আব্দুল করিম (৪৭) এবং দক্ষিণহাটি মৌটুপি এলাকার সিদ্দিক মিয়ার স্ত্রী পরিষ্কার বেগম (৫৫)।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও তৎপরতায় লিবিয়ায় অবস্থানরত মূল চক্রের ওপর চাপ সৃষ্টি হলে তারা ভুক্তভোগীদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পরে তাদের লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হয়।

বর্তমানে তারা দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।

বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দালাল চক্রের প্রলোভনে না পড়ে সরকারি অনুমোদিত নিয়োগ সংস্থার মাধ্যমে বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় অপহরণ চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অব্যাহত রয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান আছে।