জ্বালানি মজুত মাত্র ৩ মাস, অর্থনীতিতে বাড়ছে ঝুঁকি

বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতায় নাজুক জ্বালানি নিরাপত্তা, সতর্ক করলেন অর্থনীতিবিদরা।

টুইট প্রতিবেদক: দেশের জ্বালানি মজুত বর্তমানে মাত্র তিন মাসের চাহিদা পূরণে সক্ষম, এ পরিস্থিতিকে গুরুতর সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

নীতিনির্ধারণী গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) এক সেমিনারে এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আয়োজিত “সামষ্টিক অর্থনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি: বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি” শীর্ষক সেমিনারে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মাত্র তিন মাসের মজুত যেকোনো বহিরাগত ধাক্কায় অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

তিনি উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বর্তমানে দুর্বল হয়ে পড়েছে। নেতৃত্বদানকারী দেশগুলোর নীতিভঙ্গের ফলে এই কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা কমছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই সংকট শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ও বাণিজ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ উভয়ই নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে।

জ্বালানি ছাড়াও সার ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এবং বিনিময় হার সংকট কাটিয়ে ওঠার পর নতুন করে মধ্যপ্রাচ্য সংকট অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলছে।

আইএমএফ কর্মসূচি নিয়ে ড. সাত্তার বলেন, চূড়ান্ত কিস্তি পেতে হলে বিনিময় হার সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা জরুরি। যদিও বৈদেশিক খাতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে, রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাত এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধে পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান জানান, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গত ১৮ মাসে দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে গেছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হলেও প্রবৃদ্ধি কমে দ্বিতীয় প্রান্তিকে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ শতাংশে, যা কোভিড-পরবর্তী সময়ে সর্বনিম্ন।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশে পৌঁছানো এবং বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে নেমে আসা আর্থিক খাতের দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত।

একই সঙ্গে রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকারকে উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নও নিতে হচ্ছে।

অর্থনীতির ওপর তিনটি বড় বহিরাগত চাপ,মধ্যপ্রাচ্য সংকট, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির অনিশ্চয়তা,একযোগে প্রভাব ফেলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এর ফলে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি হ্রাস এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন দেখা দিচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলের প্রতিনিধিরা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, কাঠামোগত সংস্কার জোরদার করা এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক ভিত্তিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো জরুরি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, দেশের অধিকাংশ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ অভ্যন্তরীণভাবে সৃষ্ট। এসব মোকাবিলায় সাহসী ও দেশীয় উদ্যোগে সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণের বিকল্প নেই।

সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সীমিত জ্বালানি মজুত, দুর্বল আর্থিক খাত এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাব মোকাবিলায় দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।