দাবার বড় সমস্যা গ্র্যান্ডমাস্টারদের দ্বন্দ্ব: নিয়াজ মোরশেদ

দাবার অভ্যন্তরীণ বিরোধে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক; তবে অন্য গ্র্যান্ডমাস্টারদের দায় বেশি বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
টুইট প্রতিবেদক: বাংলাদেশের দাবাঙ্গনে দীর্ঘদিনের বিভেদ ও গ্র্যান্ডমাস্টারদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব খেলাটির অগ্রগতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ। তাঁর মতে, এই বিরোধের প্রভাব জাতীয় দাবার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতেও পড়েছে। তবে এ পরিস্থিতির জন্য অন্য গ্র্যান্ডমাস্টারদের দায় বেশি বলে মনে করেন তিনি।
রোববার (১ নভেম্বর) ঢাকা পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নিয়াজ মোরশেদ। সাক্ষাৎকারে জাতীয় দাবার বাছাই প্রক্রিয়া, ফেডারেশনের গঠনতন্ত্র, গ্র্যান্ডমাস্টারদের বিরোধ, অলিম্পিয়াডে দল নির্বাচন এবং দাবার ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি।
জাতীয় দাবার বাছাইপর্বে গ্র্যান্ডমাস্টারদের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে নিয়াজ বলেন, সময়ের সঙ্গে নিয়ম পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। গত আসরের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ সরাসরি মূল পর্বে খেলার সুযোগ পাবেন, বাকিদের বাছাইপর্বে অংশ নিতে হবে—এটি ফেডারেশনের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত। তাঁর দাবি, এই নিয়ম শুধু তাঁর সুবিধার জন্য করা হয়নি।
ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় দাবায় অংশ নেওয়া স্বার্থের সংঘাত তৈরি করছে কি না, এমন প্রশ্নে নিয়াজ জানান, তিনি বিষয়টি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচিত কমিটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিনিষেধ অ্যাডহক কমিটির ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। তা ছাড়া টুর্নামেন্ট ও আপিল কমিটি আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এ নিয়ে তিনি কোনো সমস্যা দেখছেন না।
গ্র্যান্ডমাস্টারদের দীর্ঘদিনের বিরোধের প্রভাব সম্পর্কে নিয়াজ বলেন, ‘জিএমদের অন্তর্দ্বন্দ্ব দাবার অন্যতম প্রধান সমস্যা। আমিও এর অংশ, অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আমার চেয়ে তাদেরই দায় বেশি।’
তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে কয়েকজন গ্র্যান্ডমাস্টারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ফেডারেশনের ক্ষমতায় ছিলেন এবং অনেক সিদ্ধান্ত তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী হয়েছে। ২০০৬ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও রাণী হামিদকে এশিয়ান গেমসে পাঠানো হয়নি উল্লেখ করে ঘটনাটিকে বাংলাদেশের দাবার ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায় বলে অভিহিত করেন তিনি।
গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পথে অন্য দাবাড়ুদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে নিয়াজ বলেন, জিয়া, রাকিব ও রাজীবের মতো দাবাড়ুরা আরও কয়েক বছর আগেই গ্র্যান্ডমাস্টার হতে পারতেন। তাঁদের বিদেশে গিয়ে খেলার পরামর্শও দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর দাবি, কাউকে বাধা দেওয়ার পরিবর্তে খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে তিনি উৎসাহিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক দাবা অলিম্পিয়াডে গ্র্যান্ডমাস্টারদের বিরোধের প্রভাব পড়ার বিষয়টিও স্বীকার করেন নিয়াজ। তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে খেলোয়াড়দের মধ্যে দূরত্ব ও মতানৈক্য দলের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০০২ সালের অলিম্পিয়াডে তাঁকে টানা কালো ঘুঁটি দিয়ে খেলানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ওই প্রতিযোগিতার ব্যর্থতার দায় তাঁর ওপর চাপানোয় পরবর্তী তিনটি অলিম্পিয়াডে অংশ নেননি বলে জানান।
অন্যদিকে, ফেডারেশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর গ্র্যান্ডমাস্টার ফাহাদ রহমানকে নিয়ে কাজ করার বিষয়ে নিয়াজ বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর বাংলাদেশে নতুন কোনো গ্র্যান্ডমাস্টার তৈরি হয়নি। ফাহাদের গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় তাঁকে এগিয়ে নেওয়াই এখন অগ্রাধিকার। পাশাপাশি নারী দাবা দলের উন্নয়নেও কাজ করতে চান তিনি।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে নিয়াজ জানান, দায়িত্বে থাকা সময়ের মধ্যে ফেডারেশনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ফাহাদকে গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে গড়ে তোলা এবং নারী দাবা দলের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে চান। বর্তমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগও তাঁর নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।
দাবার অভ্যন্তরীণ বিরোধ মিটিয়ে সবাইকে এক টেবিলে বসানোর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে অবশ্য আশাবাদী নন নিয়াজ। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের এই বিরোধ সহজে সমাধান হওয়ার নয়। তবে বাংলাদেশের দাবাকে এগিয়ে নিতে খেলোয়াড়দের পারস্পরিক সহযোগিতা ও ইতিবাচক ভূমিকা প্রয়োজন।






