ইনানীতে গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনা, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণে বাপেক্স

ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে চার দিন ধরে জ্বলছে আগুন; সম্ভাবনা সত্যি হলে দেশের ৩১তম গ্যাসক্ষেত্র হতে পারে ইনানী। নিরাপত্তায় ২০০ মিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি।
টুইট ডেস্ক: কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে নির্গত গ্যাসে সৃষ্ট আগুন চার দিনেও নেভেনি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সেখানে নতুন গ্যাসক্ষেত্র থাকার সম্ভাবনা দেখছেন পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের বিশেষজ্ঞরা। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় আগামী ১৫ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্ভাবনা নিশ্চিত হলে ইনানী হতে পারে দেশের ৩১তম গ্যাসক্ষেত্র।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় বাপেক্সের ভূতত্ত্ব বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির জানান, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সেখানে গ্যাসক্ষেত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আগামী ১৫ দিন গ্যাসের নির্গমন ও আগুনের তীব্রতা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময়ের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে উপযুক্ত পদ্ধতিতে গ্যাস নির্গমনের পথ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাপেক্সের এই কর্মকর্তা আরও জানান, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটির পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। নিজস্ব সক্ষমতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার প্রস্তুতি রয়েছে এবং আপাতত বাইরের কোনো সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে সব ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
এদিকে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিচালন ও খনি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ শোয়েব জানান, অগ্নিশিখার রং পর্যবেক্ষণ করতে কর্মকর্তারা রাতে ঘটনাস্থলে যান। আগুনের শিখায় কালচে ভাব দেখে সেখানে তেলের উপস্থিতিও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে।
নিরাপত্তায় ২০০ মিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা
আগুনের কারণে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের ২০০ মিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার রাতে উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারের সই করা আদেশে এ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
আদেশ অনুযায়ী, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই এলাকায় আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দেশলাই ও লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে, এমন সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে মেরিন ড্রাইভ থেকে ইনানী ও কোটবাজারে যাতায়াতের দুটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সড়কে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার থেকে জ্বলছে আগুন
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে ইনানী মেরিন ড্রাইভের ছোট সেতুসংলগ্ন এলাকায় মোস্তফা সিকদারের বাড়ির আঙিনায় গভীর নলকূপ খননের সময় আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথম দিকে আগুনের তীব্রতা কম থাকলেও বিকেল ৫টার পর তা বাড়তে শুরু করে। শুক্রবার পর্যন্ত আগুন অব্যাহত রয়েছে।
শুরুতে বালু ও পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ গ্যাসের নির্গমন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দেওয়াই আপাতত নিরাপদ। জোর করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে ভূগর্ভে গ্যাসের আগুন অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয় প্রায় ৯ হাজার গ্রাহক
আগুনের তীব্রতা ও বৈদ্যুতিক লাইনে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মেরিন ড্রাইভের অন্তত ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। ঘটনার দিন থেকে ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের মনখালী-পাটুয়ারটেক অংশে সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রায় ৯ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
বৃহস্পতিবার রাতে বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কেটেছে কি না, তা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সব মিলিয়ে ইনানীর এই অগ্নিকাণ্ড নতুন গ্যাসসম্পদের সম্ভাবনার পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও জ্বালানি অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। আগামী ১৫ দিনের পর্যবেক্ষণে গ্যাসের নির্গমন, আগুনের তীব্রতা এবং ভূগর্ভস্থ সম্পদের প্রকৃতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। সেই ফলাফলের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে পরবর্তী পদক্ষেপ।






