তুরাগ নদী থেকে সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার

নিখোঁজের এক দিন পর উদ্ধার; ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন সূত্রে আলোচিত, মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য নেই।

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ী এলাকার তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে উত্তরখান থানার ডিউটি অফিসার শাহীনুর জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এ তথ্য বিডিনিউজ২৪.কমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

তাহসিফ সৌরি ‘তাওসিফ সৌরি’ বা ‘তাহসিফ সুরি’ নামেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখিত হয়েছেন। তিনি রাজধানীর উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে বসবাস করতেন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন।

মরদেহ উদ্ধারের সময় নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কোথাও বুধবার বিকেল ৪টার দিকে, আবার কোথাও শুধু বিকেলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিক সংবাদে তাঁর মৃত্যুর কারণ কিংবা কী পরিস্থিতিতে তিনি নদীতে গিয়ে পড়েছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের পক্ষ থেকেও শরীরে আঘাতের চিহ্ন বা মৃত্যুর অন্য কোনো আলামত সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

তবে অন্য একটি প্রতিবেদনে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের ফলাফল ও তদন্তের অগ্রগতি থেকে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। ওই দিন তাঁর উড়োজাহাজে করে দেশত্যাগের দৃশ্য ধারণ ও প্রকাশের সঙ্গে তাহসিফ সৌরির সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। বিডিনিউজ২৪.কমের প্রতিবেদনেও এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্যের ভিডিও ধারণের সঙ্গে বিমানবাহিনীর তৎকালীন কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরির নাম আলোচনায় আসে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি গণভবনের পেছন থেকে ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন এবং সে সময় সামরিক পাইলট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে তিনি ওই ভিডিও ধারণের কথা জানিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের ঘটনার পর তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে চাকরি ছেড়ে দেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তবে ভিডিও ধারণ, প্রকাশ, চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত এবং এসব ঘটনার মধ্যকার সম্পর্ক সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

তাহসিফ সৌরি পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন বলে জানা যায়। বিমানবাহিনী-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়েও তিনি কথা বলেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি নিয়েও তাঁর সাক্ষাৎকার দেওয়ার কথা আলোচিত হয়েছে।

তাহসিফ সৌরি কীভাবে তুরাগ নদে গেলেন, তাঁর মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত কি না, কিংবা এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। নিখোঁজ হওয়ার সময়, তাঁর সর্বশেষ অবস্থান, চলাচলের তথ্য এবং ঘটনার আগে ও পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা ব্যক্তিদের বক্তব্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি তদন্ত করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং পুলিশের অনুসন্ধানের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তদন্তের ফলাফল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু মহল থেকে তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর সঙ্গে দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা বা আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে—এমন অভিযোগও প্রচারিত হচ্ছে।

তবে এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই। মৃত্যুর পেছনে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য যাচাই না করে প্রচার করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা

একজন সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার নিখোঁজ হওয়ার পর নদ থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিওর সঙ্গে তাঁর নাম আলোচনায় আসায় ঘটনাটি নিয়ে জনমনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

তবে তাঁর আলোচিত অতীত এবং বর্তমান মৃত্যুর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মৃত্যুর কারণ, ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: বিডিনিউজ২৪.কম, দৈনিক এদিন, ঢাকাপোস্ট, এমজামিন, ওটিএন বাংলা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২৮–২৯ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদন।