চীনকে মোকাবিলায় ভারতের মেগা বাঁধ, অরুণাচলে বিক্ষোভ-সহিংসতা

সিয়াং নদীতে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের প্রকল্প ঘিরে উত্তেজনা; আদিবাসীদের আশঙ্কা, ডুববে গ্রাম-জমি, হুমকিতে জীবিকা ও সংস্কৃতি।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চীনের তিব্বতে বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের প্রেক্ষাপটে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং নদীর ওপর ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকল্পটির পক্ষে ভারতের সরকার জাতীয় নিরাপত্তা ও জলনিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরলেও স্থানীয় আদি আদিবাসী সম্প্রদায়ের একাংশ এর বিরোধিতা করছে।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত নদীটি অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং এবং আসামে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়েছে। চীন তিব্বতের মেডোগ এলাকায় ইয়ারলুং সাংপো নদীতে প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে। এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভারতসহ ভাটির দেশগুলোতে উদ্বেগ রয়েছে। তবে প্রকল্পটির কারণে ভাটিতে পানিপ্রবাহ ও বন্যার ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রস্তাবিত সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্টকে (এসইউএমপি) কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং পানিসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা জোরদার করা। তবে প্রকল্পটি এখনো সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে; চূড়ান্ত নির্মাণ সিদ্ধান্তের আগে আরও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
প্রকল্পটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে আদি বানে কেবাং ইউনাইটেড, সিয়াং ইন্ডিজিনাস ফারমার্স ফোরামসহ বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠন। তাদের আশঙ্কা, বিশাল জলাধার নির্মিত হলে বহু গ্রাম, কৃষিজমি ও বসতভিটা পানির নিচে চলে যেতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিরোধীরা প্রকল্পের প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ বন্ধ এবং আটক আন্দোলনকারীদের মুক্তির দাবিও জানিয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ছাড়াই জরিপ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুর সিয়াং অঞ্চলে সফরকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ে। এরপর অক্টোবরের শুরুতে বিক্ষোভের মধ্যে ভাঙচুর ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ ২৩ অক্টোবর পাসিঘাটে প্রকল্পবিরোধী আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের একাংশ জাতীয় জলবিদ্যুৎ করপোরেশনের (এনএইচপিসি) কার্যালয়, পুলিশ স্থাপনা ও যানবাহনে আগুন দেয়। কয়েকজন জনপ্রতিনিধির বাড়িতেও ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংঘর্ষে প্রায় ৪০ পুলিশ সদস্য আহত হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় সরকার দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। পাসিঘাটে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনীর (র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স—র্যাফ) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
অরুণাচল প্রদেশের সরকার প্রকল্পটিকে কৌশলগত ও জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু বলেছেন, প্রাথমিক সমীক্ষা ও কারিগরি মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগে প্রকল্পের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। পরবর্তী ধাপে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের মতো প্রক্রিয়াও প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে, স্থানীয় আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, শুধু জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দিয়ে তাঁদের ভূমি, জীবিকা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ঝুঁকিকে উপেক্ষা করা যায় না। ফলে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কারিগরি সমীক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা ও তাদের উদ্বেগের সমাধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চীন ও ভারতের বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে সিয়াং নদী এখন আঞ্চলিক কৌশলগত প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একদিকে ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জলনিরাপত্তার পরিকল্পনা; অন্যদিকে স্থানীয় আদিবাসীদের বাস্তুচ্যুতি, পরিবেশগত ক্ষতি এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার দাবি।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে সমীক্ষার ফলাফল, পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্যায়ন, সরকারি সিদ্ধান্ত এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতার ওপর।






