কাউন্সিলের আগেই গোপন ভোটে এনসিপির নেতৃত্বে রদবদল

নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেন স্বপদে, শীর্ষ চার পদে নতুন বিন্যাস; দায়িত্ব ভাগে জোর দিয়ে পুনর্গঠন কেন্দ্রীয় কমিটি

টুইট ডেস্ক: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটিতে বড় ধরনের পুনর্গঠন করা হয়েছে। আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলের আগে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের অভ্যন্তরীণ গোপন ভোটের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় শীর্ষ নেতৃত্ব অপরিবর্তিত থাকলেও জ্যেষ্ঠ কয়েকটি পদে এসেছে পরিবর্তন।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুনর্গঠিত কমিটি ঘোষণা করে এনসিপি। নতুন কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে মো. নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব হিসেবে আখতার হোসেন দায়িত্বে রয়েছেন। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আব্দুল্লাহ। অন্যদিকে, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব হয়েছেন মো. সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত আগের কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব। সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিবের দায়িত্বে ছিলেন ডা. তাসনিম জারা ও নাহিদা সারওয়ার নিভা।

দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সামান্তা শারমিন ও নাহিদা সারওয়ার নিভা আগেই রাজনৈতিক পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। নতুন কমিটিতে সামান্তা শারমিনকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং নাহিদা সারওয়ার নিভাকে যুগ্ম সদস্যসচিব করা হয়েছে। ডা. তাসনিম জারা গত বছর দল ছেড়েছেন। আরিফুল ইসলাম আদীব রাজনৈতিক পর্ষদে থাকলেও অভ্যন্তরীণ ভোটে শীর্ষ পদ পাননি; তাঁকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এনসিপির একাধিক নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব পদ নিয়ে মতভেদ না থাকলেও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য পৃথক ভোট অনুষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক পর্ষদের ১৬ সদস্য সাদা কাগজে পছন্দের প্রার্থীর নাম লিখে বাক্সে জমা দেন। পরে বৈঠকেই ভোট গণনা করে পদগুলোর বণ্টন চূড়ান্ত করা হয়। রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্যদের জ্যেষ্ঠতার ক্রমও ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

পুনর্গঠনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে সাংগঠনিক দায়িত্বের স্পষ্টতা নিশ্চিত করার কথা বলছেন নেতারা। তাঁদের মতে, আগের কমিটিতে মুখ্য সংগঠক, মুখ্য সমন্বয়ক, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের মতো একাধিক পদ থাকায় দায়িত্বের বিভাজন নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছিল। একই কাজে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা এবং সমন্বয়হীনতা দূর করতে এসব পদ বিলুপ্ত করে বিভাগভিত্তিক সম্পাদকীয় কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।

নতুন কাঠামোয় দপ্তর, প্রচার, শিক্ষা, অর্থ, আইন, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের মতো বিভাগে দায়িত্ব বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এনসিপির আন্তর্জাতিক সম্পাদক তাহসীন রিয়াজের ভাষ্য, আগে অনেক যুগ্ম সদস্যসচিবের নির্দিষ্ট বিভাগ বা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছিল না। এখন সম্পাদকীয় পদ চালুর ফলে দায়িত্বের পরিধি ও জবাবদিহি আরও স্পষ্ট হবে।

দলটির সাংগঠনিক কাঠামো তিনটি স্তরে বিভক্ত—১৬ সদস্যের রাজনৈতিক পর্ষদ, ৫৮ সদস্যের নির্বাহী কমিটি এবং ১৯৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দলে যুক্ত হওয়া নতুন নেতাকর্মীদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা এবং আসন্ন কাউন্সিলের আগে সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করাও পুনর্গঠনের উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হকের মতে, ধারাবাহিক কাজের মূল্যায়ন না হলে যেকোনো সংগঠনে স্থবিরতা তৈরি হতে পারে। মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এবার কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদে এগিয়েছেন, আবার কেউ আগের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে, কাউন্সিলের আগে এই পুনর্গঠন এনসিপির নেতৃত্বের ভারসাম্য, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং সাংগঠনিক দক্ষতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ। তবে নতুন কাঠামো কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে দায়িত্ব বণ্টনের বাস্তব প্রয়োগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয় এবং তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমের অগ্রগতির ওপর।