দেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ বিতর্ক আবারও আলোচনায়

আনুপ্রবেশ ও গোপন তৎপরতার পাল্টাপাল্টি অভিযোগে বাড়ছে রাজনৈতিক অবিশ্বাস

টুইট ডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কোন দলের নেতা-কর্মীর রাজনৈতিক আনুগত্য কোথায়, কারা অন্য দলের পরিচয়ে সক্রিয় এবং রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ ঘটছে কি না—এসব প্রশ্নে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতারা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলছেন। এতে দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেন, গুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমে ষড়যন্ত্র চলছে। গত ১ অক্টোবর ফেনীতে এক জনসভায় তিনি বলেন, অতীতে যারা একসঙ্গে ছিল, তারা আবারও এক হয়েছে। বক্তব্যটি জামায়াতকে ইঙ্গিত করে দেওয়া হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়।

এর দুই দিন পর ঢাকায় বায়তুল মোকাররমের সামনে এক সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, আন্দোলনে জীবন দেওয়া জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের ‘গুপ্ত’ বলা উচিত নয়।

গত ১৫ অক্টোবর সরকারের প্রতিমন্ত্রী ও গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুরও অভিযোগ করেন, জামায়াত বিভিন্ন প্রক্সি সংগঠন তৈরি করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তবে জামায়াত এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

বিতর্কের সূত্রপাত যেভাবে

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবিরের নেতাদের প্রকাশ্যে আসা নিয়ে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ বিতর্ক জোরালো হয়। অভিযোগ ওঠে, তাঁদের কেউ কেউ অতীতে গোপনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের অভিযোগ, ছাত্রশিবির পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগঠনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। অতীতে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে শিবিরের নেতা হিসেবে সামনে এসেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন। তাঁর দাবি, সংগঠনটি নিয়মিত শাখা কমিটি গঠন করে এবং সেগুলোর তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও আদালতে প্রমাণিত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

গোপন রাজনীতির পুরোনো ইতিহাস

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, গোপনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রবণতা নতুন নয়। অতীতে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডকে সাধারণত ভূগর্ভস্থ বা আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি বলা হতো। তবে সময়ের সঙ্গে এর ধরন বদলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরিনের মতে, বর্তমানে কোনো দল নিষিদ্ধ না হলেও অন্য দলের ভেতরে থেকে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো কিংবা তথ্য সংগ্রহের মতো অভিযোগ সামনে আসছে। ফলে ‘গুপ্ত’ শব্দটির ব্যবহারও আগের তুলনায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।

তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ এখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। অতীতে অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা কিংবা পরে নতুন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে সামনে আসার ঘটনাকেও কখনো কখনো গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংস্কার ও জুলাই সনদ ঘিরেও বিরোধ

‘গুপ্ত রাজনীতি’ বিতর্কের সঙ্গে সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুকের অভিযোগ, সংস্কার নিয়ে আন্দোলনের নামে জামায়াত বিভ্রান্তি তৈরি করছে এবং গোপনে ষড়যন্ত্র করছে। তবে তিনি বলেন, বিএনপি সংস্কারের বিরোধী নয়।

অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে জনদৃষ্টি সরাতেই এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ এখন কেবল অনুপ্রবেশের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দলগুলোর পারস্পরিক আস্থা, রাজনৈতিক কৌশল এবং সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধেরও অংশ হয়ে উঠেছে। তবে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে নির্দিষ্ট ঘটনা ও প্রমাণের ভিত্তিতেই এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা জরুরি।