নাসামস আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিদর্শনে সেনাপ্রধান, আধুনিকায়নে নতুন সম্ভাবনা

অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সফরে সামরিক সম্মেলন ও প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের; নাসামস কেনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের তথ্য নেই।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নাসামস (NASAMS) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশে দাঁড়িয়ে থাকার একটি ছবি প্রকাশের পর দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ২২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ‘ডিফেন্স টেকনোলজি অব বাংলাদেশ’ নামের একটি প্রতিরক্ষাবিষয়ক এক্স অ্যাকাউন্টে ছবিটি প্রকাশ করা হয়। ছবিতে সেনাপ্রধানসহ কয়েকজনকে যুক্তরাষ্ট্রের আরটিএক্সের ব্র্যান্ডিংয়ের সামনে নাসামসের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযন্ত্রের পাশে দেখা যায়।

ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ইউএস আর্মির (এউএসএ) বার্ষিক সভা ও প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীর বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ছবিটির মূল উৎস, সুনির্দিষ্ট স্থান এবং পরিদর্শনের উদ্দেশ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশ নাসামস কিনতে যাচ্ছে কিংবা এ বিষয়ে কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে—এমন তথ্যও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফর করেন। সফরের অংশ হিসেবে তিনি অস্ট্রেলিয়ার পার্থে ল্যান্ড ফোর্সেস আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী ও চিফ অব আর্মি সিম্পোজিয়ামে অংশ নেন। পরে ওয়াশিংটন ডিসিতে এউএসএ বার্ষিক সভা ও প্রদর্শনীতে যোগ দেন। সফর শেষে ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তিনি দেশে ফেরেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়।

সেনাপ্রধানের এ সফর সামরিক পেশাগত যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক সামরিক সম্মেলন ও প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ করা যায়। সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে এ ধরনের উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত ধারণা দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজে লাগানো হয়, তার ওপর।

নাসামস কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

নাসামস বা ন্যাশনাল অ্যাডভান্সড সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেম নরওয়ের কংসবার্গ ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরটিএক্সের রেথিয়ন ইউনিটের যৌথভাবে উন্নয়ন করা একটি স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বিভিন্ন আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়।

ব্যবস্থাটিতে রাডার, লক্ষ্য শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করে।

কনফিগারেশন অনুযায়ী এতে এএমআরএএএম, এএমআরএএএম-ইআর এবং এআইএম-৯এক্স ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশ এই ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। ইউক্রেনের যুদ্ধেও নাসামস ব্যবহৃত হয়েছে।

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের জন্যও এ ধরনের প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। তবে কোনো ব্যবস্থা দেশের জন্য উপযোগী কি না, তা নির্ভর করে সামরিক প্রয়োজন, বিদ্যমান প্রতিরক্ষা কাঠামো, ভৌগোলিক পরিস্থিতি, প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য এবং আর্থিক সক্ষমতার ওপর। ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালন ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহব্যবস্থাও বিবেচনা করতে হয়।

সেনাপ্রধানের আন্তর্জাতিক সফর ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার উদ্যোগকে বাংলাদেশের সামরিক পেশাগত যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রেক্ষাপটে ইতিবাচকভাবে দেখা যায়। তবে কোনো নির্দিষ্ট অস্ত্রব্যবস্থা পরিদর্শন করলেই সেটি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে সামরিক প্রতিনিধিরা বিভিন্ন প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ করেন এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পান। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ক্রয়প্রক্রিয়া বা চুক্তি এক বিষয় নয়।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের নাসামস কেনার সিদ্ধান্ত, আনুষ্ঠানিক ক্রয় আলোচনা কিংবা কোনো চুক্তির বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ছবিটিকে কেন্দ্র করে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি বা অস্ত্র কেনার উদ্যোগের দাবি করা হলে তা অযাচাইকৃত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল হবে।

সেনাপ্রধানের সফর, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সামরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে নাসামস পরিদর্শনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং দেশের সামরিক আধুনিকায়নের সঙ্গে এর কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রয়োজন।

আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সামরিক পেশাগত যোগাযোগ জোরদার করার উদ্যোগ প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের আলোচনায় গুরুত্ব বহন করে। তবে নাসামসের পাশে সেনাপ্রধানের উপস্থিতির ছবি প্রকাশ এবং বাংলাদেশ কর্তৃক এই ব্যবস্থা কেনার সিদ্ধান্ত—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ না আসা পর্যন্ত বিষয়টিকে সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত আগ্রহের প্রেক্ষাপটে দেখাই যুক্তিসংগত।