মুখের ছবি বিশ্লেষণেই ক্যান্সার রোগীর আয়ুর পূর্বাভাস দেবে এআই

৪ কোটিরও বেশি মুখের ছবি দিয়ে তৈরি দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেল; চিকিৎসার ঝুঁকি নিরূপণে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন গবেষকেরা
টুইট প্রতিবেদক: ক্যান্সার রোগীর মুখের একটি সাধারণ ছবি বা সেলফি বিশ্লেষণ করেই তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে পূর্বাভাস দিতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা। তাঁদের মতে, এ প্রযুক্তি রোগীর জৈবিক বয়স ও মৃত্যুঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের অলাভজনক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের গবেষকেরা এই প্রযুক্তি তৈরি করেছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন বয়স ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ৪ কোটিরও বেশি মুখের ছবির তথ্য ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট ডিজিটাল হেলথে।
মুখের ছবিতে বয়স ও মৃত্যুঝুঁকি নির্ণয়
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি মানুষের প্রকৃত বয়স নির্ধারণের পরিবর্তে মুখের চেহারা দেখে তাঁকে কতটা বয়স্ক মনে হয়, তা বিশ্লেষণ করতে পারে। পাশাপাশি মুখের ছবিতে থাকা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে ক্যান্সার
রোগীর মৃত্যুঝুঁকি সম্পর্কেও পূর্বাভাস দিতে পারে।
এ উদ্দেশ্যে গবেষকেরা দুটি পৃথক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরি করেছেন। প্রথমটির নাম ‘এফএএইচআর-ফেসএজ’। এটি মুখের চেহারা বিশ্লেষণ করে ব্যক্তির আনুমানিক জৈবিক বয়স নির্ণয় করে এবং ক্যান্সার রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মূল্যায়নে সহায়তা করে।
দ্বিতীয় মডেলটির নাম ‘এফএএইচআর-সার্ভাইভাল’। এটি মুখের ছবি থেকে সরাসরি রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ও মৃত্যুঝুঁকি অনুমান করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। দুটি মডেলের ভিত্তি একই হলেও বয়স ও মৃত্যুঝুঁকি নিরূপণে এগুলো মুখের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ওপর গুরুত্ব দেয়।
গবেষণাপত্রের সহপ্রধান লেখক হুগো আর্টসের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখের ছবি থেকে সরাসরি ক্যান্সার রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে সক্ষম প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেল এটি বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
চেহারায় বয়সের ছাপ, মৃত্যুঝুঁকিতেও পার্থক্য
গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের রেডিয়েশন থেরাপি নেওয়া ক্যান্সার রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে চেহারায় বয়সের ছাপের সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকির একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যেসব রোগীকে তাঁদের প্রকৃত বয়সের তুলনায় অন্তত পাঁচ বছর বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছিল, পরবর্তী চার বছরে তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলকভাবে ২১ শতাংশ বেশি ছিল। অন্যদিকে, যাঁদের চেহারায় প্রকৃত বয়সের তুলনায় পাঁচ বছর বা তার কম বয়সের ছাপ ছিল, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি ১৭ শতাংশ কম দেখা গেছে।
গবেষকেরা মনে করছেন, মানুষের চেহারায় প্রতিফলিত জৈবিক বয়সের সঙ্গে শারীরিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক থাকতে পারে। এ ধরনের তথ্য কাজে লাগিয়ে চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক সক্ষমতা ও জটিল চিকিৎসা সহ্য করার সম্ভাবনা সম্পর্কে আগাম ধারণা পেতে পারেন।
তবে এসব পরিসংখ্যানকে ব্যক্তিবিশেষের আয়ু নির্ধারণের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণায় পাওয়া ঝুঁকির পার্থক্য কোনো নির্দিষ্ট রোগী কত দিন বাঁচবেন, তা সরাসরি বলে দেয় না।
চিকিৎসা পরিকল্পনায় নতুন সম্ভাবনা
ক্যান্সারের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার, বিকিরণ চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য জটিল পদ্ধতি প্রয়োগের আগে রোগীর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের বিকিরণ চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ রেমন্ড ম্যাকের মতে, জটিল চিকিৎসা শুরুর আগে রোগীর শারীরিক সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া প্রয়োজন। নতুন এই প্রযুক্তি সেই মূল্যায়নে সহায়ক হতে পারে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে,
জীবনযাত্রার বিভিন্ন অভ্যাস মানুষের মুখের বয়সের ছাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অতিরিক্ত মদ্যপান, মাদক গ্রহণ ও ধূমপানের মতো অভ্যাসের কারণে কিছু মানুষের মুখের ছবিতে তাঁদের প্রকৃত বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক দেখানোর প্রবণতা পাওয়া গেছে।
আলো, ক্যামেরার অবস্থান, মুখের অভিব্যক্তি ও প্রসাধনীর ব্যবহারে ছবির বৈচিত্র্য থাকলেও মডেলটি ধারাবাহিক ফলাফল দিয়েছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। তবে নাকের অস্ত্রোপচারের মতো কিছু ক্ষেত্রে বিশ্লেষণের ফলাফলে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেছে।
ব্যাপক ব্যবহারের আগে প্রয়োজন আরও গবেষণা
একটি সাধারণ মুখের ছবি ব্যবহার করে রোগীর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম ব্যয়সাপেক্ষ উপায়ে রোগীর প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা গেলে চিকিৎসা পরিকল্পনা আরও কার্যকর হতে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, চিকিৎসাসেবায় এ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরুর আগে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার, রোগীর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী মডেলটির পূর্বাভাস কতটা নির্ভরযোগ্য, তা আরও যাচাই করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিটি ভবিষ্যতে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতে পারে। তবে কেবল মুখের ছবি বিশ্লেষণ করে রোগীর আয়ু নির্ধারণ করা কিংবা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনই যথাযথ হবে না। রোগ নির্ণয়, শারীরিক পরীক্ষা, পরীক্ষাগারের ফলাফল এবং চিকিৎসকের সামগ্রিক মূল্যায়নের পাশাপাশি এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।






