জেন-জেডের বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লি

ভারতের ভোটার তালিকা বিতর্কে উত্তাল রাজনীতি, রাস্তায় জেন-জেড ও বিরোধীরা। ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়া নিয়ে প্রশ্ন; প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি, দিল্লিতে দুই হাজারের বেশি মানুষ আটক। 

টুইট প্রতি‌বেদক: ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন তরুণ আন্দোলনকর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

আন্দোলন ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা, গণগ্রেপ্তার ও চলাচলে বিধিনিষেধের ঘটনাও সামনে এসেছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীরা দিল্লিতে বিক্ষোভ ও মিছিল করেন। বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া স্থগিত এবং বাদ পড়া নামগুলোর নিরীক্ষার দাবিতে তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। এ আন্দোলনে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এবং বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরাও সক্রিয় রয়েছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের প্রতিবাদে দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং কয়েকটি এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিরোধীদের অভিযোগ, এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সরকার ও ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্ক
ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়ার বিষয়টি বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত ব্যক্তি, খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন ভোটার এবং একাধিকবার নিবন্ধিত নামের মতো বিষয়গুলো যাচাইয়ের অংশ।

অন্যদিকে, বিরোধী দল ও নাগরিক অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নামও বাদ পড়ে থাকতে পারে। এতে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করছেন।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর ৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সংশোধন কার্যক্রম শেষ হয়েছে, সেখানে তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এসেছে।

দিল্লিতে আটক, পরে নেতাদের মুক্তি

গত ১০ অক্টোবর দিল্লির জন্তর মন্তরে সমাবেশের পরিকল্পনা ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করে কর্তৃপক্ষ। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী, বিরোধী রাজনীতিক, সাংবাদিক ও আইনজীবীকে আটক করা হয়। আন্দোলনের কয়েকজন নেতাকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর আটক করা হয়েছিল।

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরে আদালতের নির্দেশে ককরোচ আন্দোলনের তিন নেতাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর আন্দোলনকারীরা তাঁদের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

১১ অক্টোবর আন্দোলনের নেতারা ভোটাধিকার রক্ষা ও ভোটার তালিকা সংশোধনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্যের আহ্বান জানান। পরদিন বিরোধী জোটের কর্মসূচিতেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

কেন আলোচনায় ‘ককরোচ’ আন্দোলন

ভারতের তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ’ আন্দোলন শুরুতে অনলাইন প্রচার ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ হিসেবে পরিচিতি পেলেও পরে তা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের নাম পুনর্বহালের দাবি তুলছেন।

আন্দোলনটির সঙ্গে ছাত্র, তরুণ কর্মী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনের সমর্থকেরা যুক্ত হয়েছেন। তবে আন্দোলনের ব্যাপ্তি, বিভিন্ন শহরে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এবং অভিযোগগুলোর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বাধীন যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগ ও বাস্তবতার পার্থক্য

ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নথিভুক্ত প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে সামনে এসেছে। তবে বাদ পড়া প্রতিটি নামই যে বৈধ ভোটারের, অথবা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।
একইভাবে, দিল্লিতে ব্যাপক আটকের ঘটনা ঘটলেও সেনাবাহিনী সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালাচ্ছে কিংবা দেশজুড়ে লাখ লাখ তরুণ একই সময়ে রাস্তায় নেমেছেন—এমন দাবির পক্ষে এই প্রতিবেদনগুলো যথেষ্ট প্রমাণ দেয় না।

ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে চলমান বিতর্কে এখন প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে অযোগ্য নাম বাদ দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, এ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন ও সরকার বলছে, নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরির জন্য সংশোধন প্রয়োজন।

সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।