নতুন সমীকরণে জাতিসংঘ সংস্কারের তাগিদ, খলিলুর রহমানের সঙ্গে ফ্রান্সের বৈঠক

সাধারণ পরিষদ-নিরাপত্তা পরিষদের সমন্বয় জোরদারে খলিলুর রহমান। সেপ্টেম্বর মাসে ফ্রান্সের নেতৃত্বে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যস্ত কর্মসূচি; বিশ্বসংকট মোকাবিলার পাশাপাশি জাতিসংঘ সংস্কারেও গুরুত্ব।
টুইট প্রতিবেদক: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাতিসংঘে ফ্রান্সের স্থায়ী প্রতিনিধি ও সেপ্টেম্বর মাসের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি জেরোম বোন্নাফঁ।
বৈঠকে সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের পারস্পরিক গুরুত্ব, চলমান আন্তর্জাতিক সংকট এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে উভয় পক্ষ জাতিসংঘের দুই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হন। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, মানবিক সংকট এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির নানা চ্যালেঞ্জের সময়ে সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরজুড়ে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যস্ত কর্মসূচি
বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ফ্রান্স। এ মাসের কর্মসূচিতে হাইতি, ইরান, সুদান, সিরিয়া, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকট ও পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক এবং আলোচনার বিষয় রয়েছে।
‘ফিট ফর ফিউচার’—অর্থাৎ ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করে তোলার উদ্যোগ।
নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনকারী জেরোম বোন্নাফঁর নেতৃত্বে মাসিক কর্মসূচিতে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা, বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা এবং জাতিসংঘ সনদের আলোকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ ধরনের সময়ে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নেতৃত্বের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির সরাসরি যোগাযোগকে কূটনৈতিক সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, সাধারণ পরিষদে জাতিসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে বৈশ্বিক বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়; অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিষদের মূল দায়িত্ব আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা।
দুই অঙ্গের ভূমিকা আলাদা, লক্ষ্য অভিন্ন
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদ সাংগঠনিকভাবে পৃথক হলেও আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, সংঘাত নিরসন, মানবিক সহায়তা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তাদের কার্যক্রম পরস্পরসম্পর্কিত।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও মানবিক সংকটের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক বিভাজন বাড়তে থাকায় জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। বিশেষ করে সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন সামনে রেখে নিরাপত্তা পরিষদের চলমান কার্যক্রমের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মহাসচিব নির্বাচনেও সহযোগিতার প্রসঙ্গ
জেরোম বোন্নাফঁ এর আগে ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের সভাপতির সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। ওই বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদের কর্মসূচির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায় আসে।
জাতিসংঘের মহাসচিব নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের পৃথক সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ প্রার্থীকে সুপারিশ করে এবং সাধারণ পরিষদ সেই সুপারিশের ভিত্তিতে মহাসচিব নিয়োগ করে। ফলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচনেও দুই অঙ্গের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
‘ফিট ফর ফিউচার’—সংস্কারের বার্তা
খলিলুর রহমান ও বোন্নাফঁর বৈঠকের সঙ্গে ব্যবহৃত FitForFuture বার্তাটি জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর, আধুনিক ও সক্ষম করে তোলার বৃহত্তর সংস্কার-আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
জাতিসংঘ সংস্কার নিয়ে চলমান আলোচনায় বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ‘প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার’-এর বাস্তবায়ন ও পরবর্তী পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যবস্থায় নতুন নতুন সংকট, সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবিক বিপর্যয় ও উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ সামনে আসায় জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও সেই বৃহত্তর সংস্কার প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সামনে সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ঘিরে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। একই সময়ে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে ফ্রান্স এবং পরিষদের কর্মসূচিতে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংকট।
ফলে সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি জেরোম বোন্নাফঁর মধ্যে এই বৈঠককে শুধু নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি জাতিসংঘের দুই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মধ্যে নীতিগত যোগাযোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ভূমিকার ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
তবে বৈঠকের প্রকাশিত বিবরণে কোনো নির্দিষ্ট সংকট নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত বা পৃথক কোনো সমঝোতার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের কাজের মধ্যে সমন্বয় এবং জাতিসংঘের কার্যকারিতা বাড়ানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টাই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।






