দুর্গম সীমান্তে নজরদারিতে ড্রোন, বাড়বে নিরাপত্তা সক্ষমতা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

থার্মাল ও নাইট ভিশন প্রযুক্তিতে রাতেও চলবে নজরদারি; আগামী দুই বছরে সর্বাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা।
টুইট প্রতিবেদক: দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চলঘেরা সীমান্তে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদারে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিশেষ করে যেসব সীমান্ত এলাকায় সরাসরি জনবল মোতায়েন করে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো কঠিন, সেখানে নাইট ভিশন ও থার্মাল প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্রোন ব্যবহার করে ডিজিটাল নজরদারি চালানো হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার দুর্গম ও বনাঞ্চলবেষ্টিত এলাকাসহ সামগ্রিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও নজরদারিকে আরও কার্যকর ও সহজতর করবে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে সিলেটে বিজিবি সেক্টর সদর দপ্তরে ‘সীমান্ত স্কুল অব সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড ড্রোন ওয়ারফেয়ার (SSSDW)’ উদ্বোধন শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নামফলক উন্মোচনের মাধ্যমে বিশেষায়িত এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
রাতের আঁধারেও সীমান্তে নজরদারি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের সীমান্তের কিছু অংশ অত্যন্ত দুর্গম ও বনাঞ্চলবেষ্টিত। এসব এলাকায় সরেজমিনে জনবল দিয়ে নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারি পরিচালনা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এ বাস্তবতায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার বিকল্প নেই।
নাইট ভিশন ও থার্মাল প্রযুক্তি সংবলিত ড্রোনের মাধ্যমে এসব এলাকায় দিন-রাত সার্বক্ষণিক নজরদারি পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে রাতের আঁধারেও সীমান্তের ওপারে সন্দেহজনক তৎপরতা পর্যবেক্ষণ, চোরাচালানের সম্ভাব্য রুট শনাক্ত এবং মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের চলাচল প্রতিরোধে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সীমান্তের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় ড্রোন
ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু সীমান্ত নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রাকৃতিক ও মানবিক দুর্যোগের সময়ও এর কার্যকর ব্যবহার সম্ভব বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং দুর্গম পয়েন্টে সরাসরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজে বিজিবি সদস্যরা ড্রোন প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করেছেন।
ফলে সীমান্ত নজরদারির পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় অনুসন্ধান, উদ্ধার, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ড্রোন প্রযুক্তি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা হিসেবে কাজ করবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
বেসামরিক জনবলকেও প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা
বর্তমানে এসএসএসডব্লিউ-তে বিজিবি সদস্যদের সীমান্ত নজরদারি ও ড্রোন ওয়ারফেয়ার বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বেসামরিক জনবলকেও উন্নত প্রযুক্তি ও ড্রোন পরিচালনায় দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে বিশ্বের সর্বাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তিগুলো এই প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মাদক ও অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রযুক্তির ব্যবহার
মাদক মামলার প্রসিকিউশন এবং আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারীদের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনকে যুগোপযোগী করা হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ে ল্যাব, হাজতখানা, ডগ স্কোয়াড ও আধুনিক অস্ত্রের সুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো অপচেষ্টা মোকাবিলায় সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে।
বিশেষ করে আইনগত প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে ‘মব’ বা সংঘবদ্ধ জনতার মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করা হলে প্রচলিত আইনের আওতায় তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে বলে জানান তিনি।
ড্রোন স্কুলে বাস্তবভিত্তিক মহড়া
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘সীমান্ত স্কুল অব সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড ড্রোন ওয়ারফেয়ার’-এর বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হয়।
উদ্বোধনের পর তিনি ড্রোন স্কুল কমপ্লেক্স ও ডিসপ্লে সেন্টার পরিদর্শন করেন। পরে বিজিবির দক্ষ পরিচালনায় একটি বাস্তবভিত্তিক অপারেশনাল মহড়া এবং ডাইনামিক ড্রোন ডিসপ্লে প্রত্যক্ষ করেন।
এসব প্রদর্শনীতে সীমান্ত পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহারিক সক্ষমতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। স্বাগত বক্তব্য দেন বিজিবির সিলেট সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দীন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজিবি সদর দপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, তথ্যনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ক্ষেত্রে এসএসএসডব্লিউ-এর যাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ করে দুর্গম, ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবল দিয়ে নিয়মিত নজরদারি করা কঠিন সীমান্ত এলাকায় আকাশভিত্তিক নজরদারি সক্ষমতা বাড়লে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পরিস্থিতি শনাক্ত ও প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এসএসএসডব্লিউ-এর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত জনবলনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর আকাশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের পথ আরও প্রশস্ত হলো। আগামী দিনে আধুনিক ড্রোন, থার্মাল ইমেজিং ও নাইট ভিশন প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।







