২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি: এডিবির পাশে থাকার আশ্বাস

২০৩৪ সালের মধ্যে ১২৩ লাখ কোটি টাকার অর্থনীতির লক্ষ্য; প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সংস্কার, বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের সুশাসন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর এডিবির।
নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়েছে সরকার, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এডিবি। সংস্থাটির দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়িংমিং ইয়াং বলেছেন, উৎপাদনশীল, বিনিয়োগনির্ভর ও সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে যাবে এডিবি।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির আকারের সঙ্গে তুলনা করলে লক্ষ্যটির ব্যাপ্তি সহজেই বোঝা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা, যা প্রায় ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। অর্থাৎ টাকার হিসাবে প্রায় ৬১.২০ লাখ কোটি টাকা।
অন্যদিকে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারকে ১২৩.৮ টাকা বিনিময় হার ধরে হিসাব করলে এর বর্তমান টাকার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১২৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ ১২৩.৮ লাখ কোটি টাকা। বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে বর্তমান অর্থনীতির আকারকে শুধু দ্বিগুণ করলেই হবে না; উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, শিল্পায়ন ও মানবসম্পদের সক্ষমতায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও ২০৩৪ সালের এই লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এডিবির পাশে থাকার আশ্বাস
৯ থেকে ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ সফর করেন এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়িংমিং ইয়াং। সফরকালে তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এডিবির পরবর্তী কান্ট্রি পার্টনারশিপ কৌশল, সংস্কার, বিনিয়োগ অগ্রাধিকার এবং সমন্বিত প্রবৃদ্ধি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেন।
বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইয়াং বলেন, বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করাই এডিবির উদ্দেশ্য।
এডিবির বাংলাদেশবিষয়ক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান, পরিবহন যোগাযোগ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।
ইয়াংয়ের বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশকে শুধু সংকট সামলে টিকে থাকলেই হবে না; অর্থনীতিকে সহনশীলতা থেকে কাঠামোগত রূপান্তরের দিকে নিয়ে যেতে হবে।
এক ট্রিলিয়ন ডলার মানে টাকার হিসাবে কত
১ মার্কিন ডলার ≈ ১২৩.৮ টাকা
সুতরাং, ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার = ১ লাখ কোটি ডলার
টাকার হিসাবে: ১,০০০,০০০,০০০,০০০ × ১২৩.৮ ≈ ১২৩,৮০০,০০০,০০০,০০০ টাকা
অর্থাৎ প্রায়: ১২৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৬১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমান টাকার মূল্য ধরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনীতিতে যেতে হলে অর্থনীতির আকারকে প্রায় দ্বিগুণের বেশি করতে হবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। ভবিষ্যতে টাকার বিনিময় হার পরিবর্তিত হলে ডলারে পরিমাপ করা অর্থনীতির টাকার মূল্যও পরিবর্তিত হবে। তাই ১২৩.৮ লাখ কোটি টাকা হলো বর্তমান বিনিময় হার দিয়ে করা একটি রূপান্তর হিসাব, ২০৩৪ সালের সম্ভাব্য জিডিপির সরকারি পূর্বাভাস নয়।
বর্তমান অর্থনীতি কোথায় দাঁড়িয়ে?
বিবিএসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি করেছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে দেশের অর্থনীতির আকার বর্তমান বাজারমূল্যে ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
মাথাপিছু আয়ও প্রথমবারের মতো ৩ হাজার মার্কিন ডলারের সীমা ছাড়িয়ে ৩ হাজার ২০ ডলারে উঠেছে, যা টাকার হিসাবে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৩ টাকা।
তবে এই পরিসংখ্যানের মধ্যেই অর্থনীতির দুর্বলতার সংকেত রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত কমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমেছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির আকার বাড়লেও ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগের গতি এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু গতির প্রশ্ন রয়ে গেছে
এডিবির জুলাই ২০২৬-এর পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে একটি সতর্ক চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটি ২০২৬ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
এডিবির মতে, দুর্বল রপ্তানি, কম বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরবরাহগত সীমাবদ্ধতা ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করেছে। ২০২৭ সালের পূর্বাভাস কমানোর পেছনে জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে বাংলাদেশের সামনে শুধু অর্থনীতির আকার বাড়ানোর প্রশ্ন নয়; প্রবৃদ্ধির গতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখার প্রশ্নও রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বড় বাধা
এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৯ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ থাকার কথা বলা হয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির ওপর দুই ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। একদিকে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, অন্যদিকে সুদের হার ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ বাড়ায়। এতে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
ফলে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে শুধু জিডিপি বাড়ানো যথেষ্ট হবে না; সেই প্রবৃদ্ধির সুফল মানুষের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত করাও জরুরি।
ব্যাংকিং খাত: সবচেয়ে বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের দুর্বল জায়গাগুলোর একটি ব্যাংকিং খাত। এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্টও ব্যাংক খাতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ মোকাবিলা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এডিবির পূর্বাভাসেও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে ২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এখানে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী। একদিকে ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন করতে হবে, অন্যদিকে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ সচল রাখতে হবে।
কারণ খেলাপি ঋণ কমানোর নামে যদি উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে যায়, তাহলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা না হলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও দুর্বল থাকবে।
রাজস্ব বাড়ানো ছাড়া ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য কঠিন
এডিবি কর প্রশাসন শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা এখনো দুর্বল।
ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে যেতে হলে শুধু বেসরকারি বিনিয়োগ নয়, সরকারের অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এর জন্য শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা অপরিহার্য।
তাই করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের দক্ষতা উন্নত করা এবং কর ফাঁকি কমানো হবে আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার।
বিনিয়োগই হবে মূল চালিকাশক্তি
এডিবির ইয়িংমিং ইয়াং স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বেসরকারি খাত।
তাঁর মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হলে বেসরকারি মূলধন উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হবে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতাও এই বক্তব্যের গুরুত্ব তুলে ধরে। বিবিএসের প্রাথমিক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত কমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে।
অতএব, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—দেশে নতুন বিনিয়োগ কতটা দ্রুত এবং কতটা উৎপাদনশীলভাবে বাড়ানো যাবে।
রপ্তানিতে বহুমুখীকরণ জরুরি
বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাকনির্ভর। দীর্ঘমেয়াদে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে যেতে হলে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো প্রয়োজন।
এডিবিও রপ্তানি বহুমুখীকরণকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়
এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।
কারণ শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অপরিহার্য। জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে; সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এডিবির জুলাইয়ের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের ২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধি কমানোর অন্যতম কারণ হিসেবে জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করা হয়েছে।
আঞ্চলিক যোগাযোগ বাংলাদেশের বড় সুযোগ
ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সম্পদ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারের মধ্যবর্তী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা ও মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত হতে পারে।
এডিবির মতে, পরিবহন, পণ্য সরবরাহব্যবস্থা, বন্দর, সীমান্ত অবকাঠামো ও জ্বালানি সংযোগ উন্নত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
তবে শুধু সড়ক, রেল বা বন্দর নির্মাণ করলেই হবে না। এডিবি বলছে, এর সঙ্গে দক্ষ শুল্কব্যবস্থা, সমন্বিত মানদণ্ড, পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং নির্বিঘ্ন সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানেই অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি হয়।
ডিজিটাল অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা
এডিবি চলতি বছর ২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা নয়, বরং ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার—বর্তমান ১২৩.৮ টাকা বিনিময় হার ধরে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা—মূল্যের এশিয়া-প্যাসিফিক ডিজিটাল হাইওয়ে উদ্যোগ ঘোষণা করেছে।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে ৬৫ কোটি মানুষকে উন্নত ডিজিটাল সংযোগের আওতায় আনা। এর মধ্যে ২০ কোটি মানুষ প্রথমবারের মতো ব্রডব্যান্ড সুবিধা পাবে এবং আরও ৪৫ কোটি মানুষ দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সংযোগ পাবে।
বাংলাদেশের জন্য এটি ডিজিটাল বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
মানবসম্পদই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ
এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি শুধু অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হবে না। প্রয়োজন দক্ষ শ্রমশক্তি।
এডিবি নারী ও তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ডিজিটাল হাইওয়ে উদ্যোগেও ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩০ লাখ মানুষকে ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা প্রশিক্ষণের লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে পারলে এটি অর্থনৈতিক বোঝা নয়, বরং সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধির শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
সরকারের সামনে আসল প্রশ্ন
২০৩৪ সালের মধ্যে ১২৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। কিন্তু এর জন্য আগামী আট বছরে ধারাবাহিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।
বর্তমান অর্থনীতির আকার ৬১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে লক্ষ্যভিত্তিক ১২৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় যেতে হলে উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতায় বড় পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু মূল্যস্ফীতির কারণে নামমাত্র জিডিপি বাড়লে এই লক্ষ্য প্রকৃত অর্থনৈতিক শক্তি নির্দেশ করবে না।
তাই লক্ষ্য অর্জনের মূল সূচক হওয়া উচিত—
বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা।
এডিবির বার্তায় আশাবাদ, কিন্তু শর্তও স্পষ্ট
এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়িংমিং ইয়াং বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার প্রশংসা করেছেন। শক্তিশালী প্রবাসী আয়, সেবা খাতের কার্যক্রম ও বেসরকারি খাতের সক্ষমতাকে তিনি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখছেন।
কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে একটি পরিষ্কার বার্তা রয়েছে—সংস্কার থামানো যাবে না।
কর প্রশাসন, ব্যাংকিং সুশাসন, খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগ পরিবেশ, জ্বালানি, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে ধারাবাহিক সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেওয়া কঠিন।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে রয়েছে ৬১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি, অন্যদিকে ২০৩৪ সালের লক্ষ্য প্রায় ১২৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।
এই ব্যবধান পূরণ করতে শুধু অর্থের প্রয়োজন হবে না; প্রয়োজন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন।
এডিবির সহায়তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এডিবির অর্থায়ন বা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একা এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি তৈরি করতে পারবে না। এর জন্য দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ, ব্যাংকিং খাতের আস্থা, দক্ষ প্রশাসন, স্থিতিশীল নীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দক্ষ মানবসম্পদ নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান সরকারের জন্য তাই ২০৩৪ সালের ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য কেবল একটি অর্থনৈতিক ঘোষণা নয়—এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের পরীক্ষা।
বাংলাদেশ যদি বিনিয়োগ ও উৎপাদননির্ভর অর্থনীতিতে সফলভাবে রূপান্তরিত হতে পারে, তাহলে ২০৩৪ সালের লক্ষ্য অর্জনের পথ বাস্তবসম্মত হতে পারে। আর সংস্কার বিলম্বিত হলে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম বিনিয়োগ ও জ্বালানি সংকট সেই পথকে আরও কঠিন করে তুলবে।
এডিবির বার্তাটি তাই একই সঙ্গে আশাবাদ ও সতর্কবার্তা—বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে, আন্তর্জাতিক অংশীদারও পাশে আছে; এখন প্রয়োজন সঠিক নীতি, কঠিন সংস্কার এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।






