বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত: ঝুঁকি, মূলধন সংকট ও উত্তরণের পথ

খেলাপি ঋণ, দুর্বল সম্পদমান, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের সংকট কাটিয়ে টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়তে এখনই সমন্বিত সংস্কার জরুরি।

লেখক: মোঃ আশরাফুল আলম সজীব, এফআইপিএ, এফএফএ, অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি: 

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ব্যাংকিং খাত। শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের আর্থিক কর্মকাণ্ড সবকিছুর সঙ্গেই ব্যাংকিং ব্যবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কেবল ব্যাংকের নিজস্ব সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও।

একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা শুধু তার সম্পদের আকার কিংবা মুনাফার পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রক মূলধন, শক্তিশালী তারল্য অবস্থান এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো থাকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে আর্থিক ঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রক মূলধনের ঘাটতি তাই বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

খেলাপি ঋণ: সংকটের কেন্দ্রবিন্দু

ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ঋণের মানের অবনতি বা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি। ঋণগ্রহীতা সময়মতো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়ে। এর ফলে ব্যাংককে অতিরিক্ত সংস্থান রাখতে হয়, মুনাফা কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সংরক্ষিত মুনাফা বা রিটেইনড আর্নিংস কমে গিয়ে মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।

সহজ ভাষায়, এর একটি ধারাবাহিক প্রভাব রয়েছে—

উচ্চ ঋণঝুঁকি → বেশি খেলাপি ঋণ ও প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি → বেশি সংস্থান → কম মুনাফা → কম সংরক্ষিত মুনাফা → কম মূলধন → মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাতের ওপর চাপ।

এই কারণেই খেলাপি ঋণকে শুধু আদায়যোগ্য ঋণের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি ব্যাংকের মুনাফা, মূলধন এবং শেষ পর্যন্ত আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি কতটা বহুমাত্রিক

ব্যাংকের ঝুঁকি কেবল ঋণঝুঁকিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাজারঝুঁকি, তারল্যঝুঁকি, ব্যাংকিং বইয়ের সুদহারঝুঁকি, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, পরিচালনাগত ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত ঋণকেন্দ্রীকরণের ঝুঁকিও ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করতে পারে।

বিশেষ করে সুদহার ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে বিনিয়োগ ও ব্যালান্স শিটের মূল্যায়ন এবং আয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে তারল্যঝুঁকি দেখা দিলে আমানতকারীর আস্থা ও তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আবার জালিয়াতি, প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা থেকেও সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।

অর্থাৎ ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে।

মূলধন পর্যাপ্ততা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ হলো নিয়ন্ত্রক মূলধন। বাসেল-৩ কাঠামোতে মূলধনের প্রধান স্তর হলো কমন ইকুইটি টিয়ার-১, অতিরিক্ত টিয়ার-১ এবং টিয়ার-২ মূলধন। ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে পর্যাপ্ত মূলধন রাখা হলে ব্যাংক সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করে।

মূলধন পর্যাপ্ততার ধারণাটি সহজভাবে বোঝা যায় এভাবে-

মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত = নিয়ন্ত্রক মূলধন ÷ ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ × ১০০।

এখানে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বা আরডব্লিউএ যত দ্রুত বাড়বে, একই হারে মূলধন না বাড়লে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত কমে যাবে। তাই শুধু মূলধন বাড়ানো নয়, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের গঠন ও বৃদ্ধিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন তৈরি হচ্ছে মূলধন ঘাটতি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতির পেছনে একক কোনো কারণ নেই। উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন ও অনুমোদন ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত সংস্থান, অতিরিক্ত ঋণকেন্দ্রীকরণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ প্রদান, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, কম মুনাফা, নেতিবাচক সঞ্চিত আয়, দ্রুত ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বৃদ্ধি এবং বাজার ও পরিচালনাগত ক্ষতি—সব মিলিয়ে মূলধনের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মূলধন ঘাটতিকে যদি শুধু ‘টাকা কম’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সমস্যার গভীরে যাওয়া হবে না। মূলধন কেন ক্ষয় হচ্ছে—সেটিই আগে চিহ্নিত করতে হবে।

আইএফআরএস-৯: সামনে নতুন বাস্তবতা

ব্যাংকিং খাতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো আইএফআরএস-৯ ভিত্তিক প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি বা ইসিএল কাঠামো। আপলোড করা লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখের বিআরপিডি সার্কুলার লেটার নং ০৩-এর মাধ্যমে আইএফআরএস-৯ ভিত্তিক প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি কাঠামো বাস্তবায়নের রোডম্যাপ দিয়েছে, যার মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রত্যাশিত ক্ষতিভিত্তিক সংস্থান কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—ঋণগ্রহীতার ঋণমানের অবনতি ঘটার পর শুধু ক্ষতি স্বীকার না করে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ক্ষতিকেও আগেভাগে বিবেচনায় আনা। ফলে ব্যাংকের সংস্থান, মুনাফা এবং মূলধন পরিকল্পনার ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।

তাহলে উত্তরণের পথ কী

মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় শুধু নতুন মূলধন সংগ্রহ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মূলধন ক্ষয়ের কারণগুলোও একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।

স্বল্পমেয়াদে যা করতে হবে

প্রথমত, বড় ও দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষায়িত ও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, উচ্চঝুঁকির কিন্তু কম-রিটার্নের সম্পদ কমিয়ে ঝুঁকি-সমন্বিত পোর্টফোলিও গড়ে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, প্রকৃত ঋণঝুঁকি যথাযথভাবে চিহ্নিত করে সংস্থান ঘাটতি কমাতে হবে। চতুর্থত, পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যকারিতা ও সংরক্ষিত মুনাফা বাড়াতে হবে। আর যেসব ব্যাংক মূলধন-সংকটে রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লভ্যাংশ বিতরণের পরিবর্তে মূলধন সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

মধ্যমেয়াদে প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন

মধ্যমেয়াদে প্রয়োজন হবে নতুন ইকুইটি বা মূলধন সংযোজন, যোগ্য অতিরিক্ত টিয়ার-১ ও টিয়ার-২ মূলধন সংগ্রহ, উন্নত ঋণ মূল্যায়ন ব্যবস্থা, ঋণ পোর্টফোলিওর বৈচিত্র্য, নিয়মিত চাপ-পরীক্ষা, শক্তিশালী আইসিএএপি এবং ঝুঁকিভিত্তিক সুদহার নির্ধারণ।

দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে হতে হবে তথ্যনির্ভর

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের টেকসই সংস্কারের জন্য আগামী দিনে প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব আরও বাড়বে। প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি নিরূপণ, সম্ভাব্য খেলাপি ঋণগ্রহীতা শনাক্তকরণ, ঋণঝুঁকি পরিমাপ এবং মূলধন পরিকল্পনায় উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ক্ষেত্রে পিডি, এলজিডি ও ইএডি মডেলিং, উন্নত ঝুঁকি বিশ্লেষণ, প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা, শক্তিশালী তথ্য ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত ঝুঁকি ও মূলধন ব্যবস্থাপনা, বাসেল-৩-এর পরবর্তী কাঠামো এবং শক্তিশালী করপোরেট সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিসচেতন সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।

অর্থ, ঝুঁকি ও ট্রেজারি বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে

ব্যাংকের মূলধন ব্যবস্থাপনা কোনো একটি বিভাগের একক দায়িত্ব নয়। একটি কার্যকর সমন্বিত কাঠামো হতে পারে—

ঝুঁকি শনাক্তকরণ → ঝুঁকি পরিমাপ → প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি ও সংস্থান → ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ নিরূপণ → মূলধন প্রয়োজন নির্ধারণ → আইসিএএপি ও চাপ-পরীক্ষা → মূলধন পরিকল্পনা → ব্যবস্থাপনা সিদ্ধান্ত → পরিচালনা পর্ষদের তদারকি ও ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ।

এ ধরনের সমন্বিত কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হলে অর্থ বিভাগ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ট্রেজারি এবং ব্যবসা বিভাগের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও কার্যকর হতে পারে।

পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার ভূমিকা

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত যথাযথ ঝুঁকি গ্রহণের সীমা, মূলধন কৌশল এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। সিনিয়র ব্যবস্থাপনাকে একটি বাস্তবসম্মত মূলধন পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

অর্থ বিভাগের প্রধান নজর হওয়া উচিত মুনাফা, সংস্থান, ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ এবং মূলধনের পূর্বাভাসে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগকে গুরুত্ব দিতে হবে ঋণঝুঁকি, প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি, চাপ-পরীক্ষা এবং ঝুঁকির অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবনে। আর ট্রেজারি বিভাগের প্রধান নজর হওয়া উচিত তারল্য, তহবিল সংগ্রহ এবং ব্যালান্স শিটের সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনায়।

শুধু মূলধন নয়, বদলাতে হবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতি

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতিকে কেবল একটি ‘মূলধনের সংকট’ হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র ধরা পড়বে না। এর পেছনে রয়েছে সম্পদের মানের অবনতি, ঋণঝুঁকি, খেলাপি ঋণ, কম মুনাফা, দুর্বল সুশাসন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রভাব।

তাই টেকসই সমাধানের পথ হতে হবে—

ঝুঁকি কমানো + খেলাপি ঋণ আদায় + যথাযথ সংস্থান + মুনাফা বৃদ্ধি + ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা + মূলধন সংগ্রহ + শক্তিশালী সুশাসন।

শুধু নতুন মূলধন ঢেলে দিলে সাময়িকভাবে মূলধন ঘাটতি কমতে পারে; কিন্তু ঋণের মান, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থেকে গেলে ভবিষ্যতে আবারও মূলধন ক্ষয়ের ঝুঁকি থাকবে। বিপরীতে, শক্তিশালী ঋণ মূল্যায়ন, কার্যকর সংস্থান ব্যবস্থা, উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ, আইসিএএপি, চাপ-পরীক্ষা এবং সুশাসনের সমন্বিত প্রয়োগ ব্যাংকগুলোকে শুধু নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণে নয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা অর্জনেও সহায়তা করতে পারে।

মূল বার্তাটি তাই স্পষ্ট—বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে বাঁচাতে শুধু মূলধন বাড়ালেই হবে না; একই সঙ্গে ঝুঁকি কমাতে হবে, সম্পদের মান উন্নত করতে হবে, সুশাসন শক্তিশালী করতে হবে এবং তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।