ভয়াবহ লোডশেডিং, অনেক এলাকায় ১০ ঘণ্টাও নেই বিদ্যুৎ

গ্যাস ও কয়লা সংকটে উৎপাদন ঘাটতি, কমেছে ভারতীয় বিদ্যুতের সরবরাহ; তীব্র গরমে দুর্ভোগ চরমে

টুইট ডেস্ক: দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। তীব্র গরমের মধ্যে গত কয়েক দিনের বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (৯ আগস্ট) বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতির নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের হিসাবে, রোববার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। বিকেল ৫টায় সরবরাহ কিছুটা বেড়ে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট হলেও তখনও ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট।

গ্যাস ও কয়লার সংকটে উৎপাদন কম

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গ্যাস ও কয়লার সংকটের পাশাপাশি কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

সাধারণত সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও রোববার বিকেল ৫টায় সরবরাহ ছিল মাত্র ৮১৫ মেগাওয়াট।

আদানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহনে সমস্যা হওয়ায় কয়লার মজুত কমেছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমাতে হয়েছে। তবে তাদের দেওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।

একাধিক কেন্দ্রেও কমেছে উৎপাদন

আদানি ছাড়া বড়পুকুরিয়া, বরিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল, এসএস পাওয়ার ও আরএনপিএলসহ কয়েকটি কেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে।

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট হলেও রোববার উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৭১০ মেগাওয়াট। একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় সেখানে উৎপাদন আরও কমে যায়।

ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৬৫ মেগাওয়াট। অন্যদিকে এসএস পাওয়ারের দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট, যদিও কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট।

গ্যাসের ঘাটতিতে কমেছে ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন

বিদ্যুৎ খাতে প্রতিদিন ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কম হচ্ছে।

রোববার বিকেল ৫টায় দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট।

এ ছাড়া তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রের সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, গ্যাস সংকটের কারণে অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট এবং কয়লা সংকটসহ অন্যান্য কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে আরও প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মূলত এই প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতির কারণেই দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।

বাড়তে পারে গ্যাস সরবরাহ

এদিকে গত ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে দৈনিক প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ শিল্প খাতে গ্যাস সংকট তীব্র হয়।

মেরামত শেষে গত ৫ আগস্ট রাতে ওই টার্মিনাল থেকে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। রোববার সন্ধ্যা ৬টায় দেশের দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে মোট ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর আগে সরবরাহ ছিল প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে আজ সোমবার রাত ১১টার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। সেটি সম্ভব হলে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।

তবে পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ কখন শুরু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট থেকে সহসাই স্বস্তি মিলবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।