তারাগঞ্জে গণপিটুনিতে দুই মুচি হত্যার এক বছর

‘আমরা চোর নই’-প্রাণভিক্ষার সেই আকুতি আজও কাঁদায় স্বজনদের
নিজস্ব প্রতিবেদক, তারাগঞ্জ: ‘আমরা চোর নই। জুতা সেলাই করে জীবন চালাই। আমাদের মারবেন না।’ দুই হাত জোড় করে প্রাণ বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিলেন রূপলাল রবী দাস ও তার জামাতা প্রদীপ দাস। কিন্তু সেদিন তাদের সেই আকুতি শোনার মতো কেউ ছিল না।
চোর সন্দেহে একদল মানুষের মারধরের পর ঘটনাস্থলে জড়ো হয় আরও মানুষ। বটতলা থেকে বুড়িরহাট বাজার পর্যন্ত দফায় দফায় চলে মারধর। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
রংপুরের তারাগঞ্জে গত বছরের ৯ আগস্ট ঘটে যাওয়া সেই গণপিটুনির ঘটনায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের কাছে ঘটনাটি এখনো দুঃস্বপ্নের মতো। চোর সন্দেহে দলিত সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সারা দেশে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
নিহত রূপলাল রবী দাস পেশায় ছিলেন জুতা সেলাইকারী। আর তার জামাতা প্রদীপ দাস ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সেদিন বিয়ের কথাবার্তা ঠিক করতে শ্বশুরের বাড়িতে যাচ্ছিলেন প্রদীপ। কিন্তু আর বাড়ি ফেরা হয়নি তার।
বিয়ের কথাবার্তা ঠিক করতেই বেরিয়েছিলেন প্রদীপ
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন প্রদীপ দাস মিঠাপুকুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ এলাকা থেকে ভ্যান নিয়ে তার শ্বশুর রূপলাল রবীদাসের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। রূপলালের মেয়ে নূপুর দাসের বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। সেদিন বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করার কথা ছিল।
সন্ধ্যার পর তারাগঞ্জের সয়ার ইউনিয়নের কাজীরহাট এলাকায় এসে রাস্তা চিনতে না পেরে শ্বশুর রূপলালকে ফোন করেন প্রদীপ। পরে রূপলাল সেখানে গেলে দুজন একই ভ্যানে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
রাত ৯টার দিকে তারাগঞ্জ-কাজীরহাট সড়কের বটতলা এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাদের ভ্যানচোর সন্দেহে থামান। এরপর ‘ভ্যানচোর আটক হয়েছে’—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে সেখানে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ওই এলাকায় ভ্যান চুরির একটি ঘটনা ঘটেছিল। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। সেই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রদীপের ভ্যানে থাকা একটি বস্তা থেকে কয়েকটি প্লাস্টিকের বোতল বের করা হয়। বোতলের ভেতরের তরল নিয়ে নানা সন্দেহের কথা ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে রূপলাল ও প্রদীপকে মারধর শুরু করা হয়। বটতলা থেকে তাদের মারতে মারতে বুড়িরহাট বাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে।
‘আমরা চোর নই’—তবু থামেনি মারধর
প্রাণ বাঁচাতে রূপলাল ও প্রদীপ বারবার নিজেদের পরিচয় ও পেশার কথা জানান। তারা বোঝানোর চেষ্টা করেন, তারা চোর নন। একজন জুতা সেলাই করে এবং অন্যজন ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান।
কিন্তু তাদের সেই আকুতিও উত্তেজিত জনতাকে থামাতে পারেনি। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে তাদের জীবন বাঁচানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
তৎকালীন তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ ফারুকের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গেলেও সেখানে মানুষের সংখ্যা ছিল বিপুল—প্রায় দুই থেকে তিন হাজার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও পুলিশের সদস্যসংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম।
ওই কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, একপর্যায়ে জনতা পুলিশের ওপরও চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে। নিজেদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে সরে আসতে বাধ্য হন।
পরে রাত ১১টার দিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। গুরুতর আহত অবস্থায় রূপলাল ও প্রদীপকে উদ্ধার করা হয়।
একজনের মৃত্যু হাসপাতালে, আরেকজনেরও পরদিন
তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক রূপলাল রবীদাসকে মৃত ঘোষণা করেন।
গুরুতর আহত প্রদীপ দাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন ভোরে তার মৃত্যু হয়।
দুই পরিবারের স্বজনদের কাছে সেই রাত হয়ে ওঠে ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন। বিয়ের কথাবার্তা ঠিক করতে বের হওয়া প্রদীপ আর বাড়ি ফিরতে পারেননি। একই সঙ্গে স্বজন হারান রূপলালের পরিবার।
পুলিশের ভূমিকায়ও উঠেছিল প্রশ্ন
ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে একজন উপপরিদর্শকসহ ছয় পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে জানা যায়। তৎকালীন পুলিশ সুপার আবু সাইম এ ব্যবস্থা নেন।
ঘটনাটি ঘিরে গণপিটুনির সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
অজ্ঞাত ৭০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
ঘটনার পরদিন নিহত রূপলাল রবীদাসের স্ত্রী ভারতী রানী দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাত প্রায় ৭০০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এসব ভিডিও বিশ্লেষণ করে হামলায় জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তারাগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল্লাহ আল মামুদ বলেন, ‘এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১৫ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে তারা সবাই জামিনে রয়েছেন। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।’
‘স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে কষ্টে আছি’
নিহত রূপলালের স্ত্রী মালতী রাণী দাস বলেন, ‘যারা আমার স্বামীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তারা শুধু একজন মানুষকে হত্যা করেনি, একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছি। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।’
রূপলালের মা লাচিয়া দাস বলেন, ‘রূপলালই ছিল আমার একমাত্র ছেলে। তাকে হারিয়ে আমার বুক শূন্য হয়ে গেছে। আমার নাতি-নাতনিদের এতিম করে দিয়েছে। এখন আমাদের দেখার কেউ নেই।’
এক বছর পরও সেই রাতের কথা মনে পড়লে স্বজনদের চোখে পানি আসে। ‘চোর’ সন্দেহে দুই নিরীহ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার সেই ঘটনা তারাগঞ্জে শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি নয়; এটি জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ভয়াবহ পরিণতিরও একটি নির্মম দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
স্বজনদের প্রত্যাশা, মামলার বিচার দ্রুত শেষ হবে এবং প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে।






