মরক্কো থেকে সেউতায় ৬০ হাজার অভিবাসীর ঢল: নিহত অন্তত ৫৭

২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৫০–৬০ হাজার মানুষের সীমান্ত অতিক্রম; অধিকাংশ স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরলেও খাদ্য, আশ্রয় ও নিরাপত্তা সংকটে এখনো অচলাবস্থা।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মরক্কো থেকে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার অভিবাসীর নজিরবিহীন ঢল নেমেছে। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া টপকে, ঘুরে কিংবা সমুদ্রপথে সাঁতরে হাজার হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেন।

এই ঘটনায় অন্তত ৫৭ জন নিহত হয়েছেন বলে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অধিকাংশের মৃত্যু ডুবে যাওয়া এবং সীমান্তে প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে পদদলিত হওয়ার কারণে হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) থেকে শুক্রবার (৩১ জুলাই) পর্যন্ত এই ব্যাপক অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে। প্রায় ৮৫ হাজার জনসংখ্যার ছোট্ট শহর সেউতায় একদিনেই এত মানুষের প্রবেশে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ একে ‘অসহনীয় মানবিক সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

সেউতা সরকারের প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস জানান, প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। তবে পরদিন সন্ধ্যার মধ্যেই প্রায় ৪৮ হাজার ৩০০ অভিবাসী স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে যান। তারপরও কয়েক হাজার মানুষ সেউতায় অবস্থান করায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা মারাত্মক চাপে পড়ে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিস্থিতিকে ‘অসহনীয়’ এবং স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, মানবপাচারকারী চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে মানুষকে সীমান্ত অতিক্রমে উৎসাহিত করেছে। সাম্প্রতিক এক সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে গুজব ছড়ানো হয় যে সমুদ্রপথে প্রবেশকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো হবে না। সরকার বলছে, এই বিভ্রান্তিই ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে সীমান্তে জড়ো হতে উৎসাহিত করেছে।

সংকট মোকাবিলায় স্পেন অতিরিক্ত পুলিশ, সেনা ও সীমান্তরক্ষী মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে সমুদ্রসীমা চিহ্নিত করতে নতুন ভাসমান প্রতিবন্ধক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে। ইতালি সাময়িকভাবে শেঙ্গেন ব্যবস্থার কিছু অংশে নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করার ঘোষণা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মরক্কোর অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ বেকারত্ব, সামাজিক হতাশা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য এই অভিবাসী ঢলের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি স্পেন–মরক্কো সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন নিয়েও আলোচনা রয়েছে, যদিও মরক্কো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সীমান্ত খুলে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এর আগেও ২০২১ সালে প্রায় ৮ হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন। তবে এবারের ঘটনা সংখ্যা ও প্রাণহানির দিক থেকে সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সীমান্ত সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে অধিকাংশ অভিবাসী ফিরে গেলেও সেউতায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ অভিবাসন নীতি নিয়ে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।