ঋণসংক্রান্ত বিরোধে ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফুল হত্যা: মূল অভিযুক্তদের খুঁজছে পুলিশ

ব্যাংক কর্মকর্তার নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জোরদার। আরিফুল হত্যার প্রতিবাদে দেশজুড়ে ব্যাংকারদের ক্ষোভ।
নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন উত্তরা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মো. আরিফুল ইসলাম (৪৫)। মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
সোমবার (৬ জুলাই) সন্ধ্যা সাতটার দিকে ব্যাংকিং কার্যক্রম শেষে গোপীনাথপুর বাজার অতিক্রম করে বাসায় ফেরার পথে তাঁর ওপর হামলা করে দুর্বৃত্তরা। একপর্যায়ে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। স্থানীয় লোকজনের চিৎকারে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
উদ্ধার করে প্রথমে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তিনি মারা যান।
প্রতিবাদ ও মানববন্ধন
নিহতের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মঙ্গলবার (৮ জুলাই) বিকেলে গোপীনাথপুর বাজারে হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। তাঁরা অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ঋণসংক্রান্ত বিরোধের আশঙ্কা
স্থানীয় সূত্র জানায়, আরিফুল যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সেখানে আলী হোসেন নামে এক ব্যক্তি বাস করতেন। আলী সম্প্রতি উত্তরা ব্যাংক থেকে সাত-আট লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ঋণ আদায় বা পূর্ববিরোধের কারণে এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কেউ এখনও অভিযোগ করেনি, তবে তদন্ত চলছে।
নিহত আরিফুল ইসলাম জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি কসবার গোপীনাথপুর গ্রামে ভাড়া বাসায় থাকতেন।
উত্তরা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, সহকর্মীবৃন্দ ও স্থানীয়রা এই অকালমৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এই ঘটনায় ব্যাংকিং খাতে কর্মরতদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের কাছে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যাংকারদের প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর থেকে উত্তরা ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেকে বলছেন, “ঋণ আদায়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।”
একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আরিফুল ভাইয়ের মতো অনেকেই ঋণখেলাপিদের চাপে পড়ে মানসিক চাপে থাকেন। এখন দেখা যাচ্ছে শারীরিক নিরাপত্তাও নেই। এভাবে চললে ব্যাংকিং সেবা ব্যাহত হবে।”
ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিক্রিয়া:
বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠন এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাঁরা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন। একইসঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানানো হয়েছে।
কসবা থানার ওসি আলী মোহাম্মদ রাশেদ জানান, তদন্ত চলছে। ঋণসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হবে।
জেলা প্রশাসনও ঘটনার নিন্দা করে বলেছে, এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনার পর ব্যাংকিং খাতে কর্মরতদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকে বলছেন, ঋণ আদায়ের সময় ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য পুলিশি সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করা উচিত। না হলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তে পারে।






