দখলদারদের কবলে বিদ্যালয়ের মাঠ: নিরাপত্তা ঝুঁকিতে তারাগঞ্জের শিক্ষার্থীরা

বিদ্যালয়ের মাঠ দখলে হাট, খেলাধুলা বন্ধ—ঝুঁকিতে একটি প্রজন্ম।
তারাগঞ্জ ও/এ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বছরের পর বছর বাজার; শিক্ষা, ক্রীড়া ও সামাজিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ।
নিজস্ব প্রতিনিধি, তারাগঞ্জ (রংপুর): রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তারাগঞ্জ ও/এ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ দীর্ঘদিন ধরে হাট-বাজারের দখলে রয়েছে। সপ্তাহে দুই দিন নিয়মিত হাট বসানো, বাকি সময় গবাদিপশু চরানো এবং মাঠের অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চললেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠজুড়ে অসংখ্য খানাখন্দ, বৃষ্টির পানি জমে থাকা, প্লাস্টিক, পলিথিন, পচনশীল বর্জ্য ও পশুর মলে মাঠটি খেলাধুলার সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। একসময় বিদ্যালয়ের ক্রীড়া কার্যক্রম, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং ফুটবল-ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মাঠটি এখন অস্থায়ী হাটে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি শুক্রবার ও সোমবার মাঠজুড়ে হাট বসে। বাজার শেষে মাঠে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে ময়লা-আবর্জনা। সামান্য বৃষ্টিতেই মাঠে পানি জমে যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা তো দূরের কথা, স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হয়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, মাঠ হারিয়ে যাওয়ায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে খেলাধুলার আগ্রহ কমছে। বিদ্যালয় শেষে অনেক শিক্ষার্থী এখন মোবাইল ফোন ও অনলাইন গেমে সময় কাটাচ্ছে। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হাটের দিন অতিরিক্ত মানুষের সমাগম ও যানজটের কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বিশেষ করে ছাত্রীদের চলাচলে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের দাবি, এতে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে।
তারাগঞ্জ ও/এ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবাদুল ইসলাম বলেন, “যে মাঠে আমরা খেলাধুলা করে বড় হয়েছি, সেই মাঠ আজ বাজারের দখলে। বিদ্যালয়ের মাঠ শিক্ষার্থীদের জন্য, ব্যবসার জন্য নয়। দ্রুত বাজার সরিয়ে মাঠটি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা উচিত।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক শিক্ষার্থী তাজমুল ইসলাম তাজু বলেন, “প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর বিদ্যালয়ের মাঠে বাজার বসছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মাঠটি স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাবে।”
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসলাম হোসেন বলেন, “মাঠে বাজার বসার কারণে আমরা খেলতে পারি না। মাঠ নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা আমাদের খেলার মাঠ ফিরে চাই।”
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুসা সরকার বলেন, “মাঠটি বিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তি। সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবেল রানা মাঠ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং আংশিক সংস্কারও হয়েছিল। কিন্তু তাঁর বদলির পর কাজটি আর এগোয়নি। বর্তমানে হাটের ইজারাদার অবৈধভাবে মাঠে বাজার বসাচ্ছেন। এতে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”
এ বিষয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোনাব্বর হোসেন বলেন, “মাঠে হাট বসার বিষয়টি নতুন নয়, পাঁচ-ছয় বছর ধরেই এটি চলে আসছে। সপ্তাহে দুই দিন সকালে হাট বসে, বিকেলে মাঠ খালি থাকে। মাঠটি সংস্কার করে খেলাধুলার উপযোগী করা প্রয়োজন।”
শিক্ষা ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যালয়ের মাঠ দীর্ঘদিন দখলে থাকলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি ক্রীড়া কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি খেলার মাঠ হারানো মানে একটি প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের অন্যতম ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে অবিলম্বে হাট-বাজার অপসারণ, বিকল্প স্থানে বাজার স্থানান্তর, মাঠের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং মাঠটি শিক্ষার্থীদের জন্য স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।






