যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি: পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জেনেভায় স্বাক্ষর শুক্রবার

১৫ জুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জাতীয় পরিষদে ভাষণ দেওয়ার সময়

যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ ১৪ দফা খসড়া; ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্য!

টুইট প্রতিবেদক: তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের অবসান ঘটাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই এই চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত হবে, যার আয়োজক হিসেবে থাকবে পাকিস্তান।

সোমবার (১৫ জুন) জাতীয় পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, তীব্র ও দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, উভয় পক্ষ লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযানের স্থায়ী অবসানে সম্মত হয়েছে এবং এটিকে “ঐতিহাসিক মাইলফলক” ও “শান্তির বিজয়” হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের আগে এই সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারীরা একাধিক বৈঠকের আয়োজন করবেন, যা প্রযুক্তিগত আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের ভিত্তি তৈরি করবে। কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্কের ভূমিকার প্রশংসাও করেন তিনি।

একই দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেন এবং হরমুজ প্রণালি টোল-মুক্তভাবে খুলে দেওয়ার কথা জানান। তিনি আরও বলেন, ইরানি বন্দরের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে, তবে এসব ব্যবস্থা স্বাক্ষরের পর কার্যকর হবে। অন্যদিকে, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হবে।

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এটি একটি প্রাথমিক কাঠামোগত চুক্তি বা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং, যার ভিত্তিতে ১৯ জুন স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইরানি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত ১৪ দফা খসড়া অনুযায়ী, এতে অবিলম্বে ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অ-হস্তক্ষেপ, ৩০ দিনের মধ্যে ইরানি বন্দরের ওপর নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

চুক্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশেপাশে সামরিক উপস্থিতি হ্রাস করবে এবং আলোচনাকালে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত থাকবে। একই সঙ্গে ইরানি তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হবে এবং ইরানের ফ্রোজেন সম্পদের একটি অংশ—প্রায় ২৪ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার—মুক্ত করা হবে। নিউক্লিয়ার ইস্যুতে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং আলোচনাকালে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত রাখবে।

এছাড়া, ইরানের পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে একটি মনিটরিং ব্যবস্থাও থাকবে। তবে ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে এখনও কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে এবং দেশটি কিছু শর্তে আপত্তি জানাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার পর এই সংঘাত শুরু হয়, যাতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহও এতে ব্যাহত হয়। এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিকে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন বিশ্বনেতা পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রশংসা করেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে এটি এখনও একটি প্রাথমিক চুক্তি হওয়ায় ১৯ জুনের স্বাক্ষর এবং পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার ওপরই এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।