পশ্চিমবঙ্গে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ পরিকল্পনা ঘিরে বিতর্ক

কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা শনাক্তে নতুন উদ্যোগ, মানবাধিকার প্রশ্নে উদ্বেগ।
টুইট ডেস্ক: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কথিত ‘বাংলাদেশি’ ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের আটক রাখতে প্রতিটি জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী আটক শিবির গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও বিবিসি বাংলার তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর সম্প্রতি এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জেলা পুলিশ প্রশাসনের কাছে পাঠিয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছেন,এমন সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত, যাচাই ও প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে রাখা হবে। একই সঙ্গে কারাদণ্ড শেষ হওয়ার পর নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর অপেক্ষায় থাকা বিদেশিদেরও সেখানে রাখা হতে পারে।
কেন্দ্রের নির্দেশনার ধারাবাহিকতা
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বছর যে নির্দেশনা জারি করেছিল, তার আলোকে বিভিন্ন রাজ্যে অনুরূপ হোল্ডিং সেন্টার গড়ে তোলা হয়। গুজরাট, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, দিল্লি ও ওড়িশা–সহ বিভিন্ন এলাকায় গত এক বছরে অভিযান চালিয়ে হাজারো মানুষকে আটক করা হয়েছিল।
এসব অভিযানে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিলেন বাংলাভাষী মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিক, যাদের অনেকেই পরে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত হন। অভিযোগ রয়েছে, শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলা ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই অনেককে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়।
কী এই ‘হোল্ডিং সেন্টার’?
বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হোল্ডিং সেন্টারগুলো মূলত স্থায়ী কারাগার নয়। বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠানবাড়ি, সরকারি ভবন বা বড় প্রাঙ্গণ অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করে সেখানে আটক ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে।
আটকের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করতে তার দাবি করা ঠিকানার জেলা পুলিশের কাছে তথ্য পাঠানো হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। এ সময় আটক ব্যক্তিদের বাইরে যেতে দেওয়া হয় না এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
পরিযায়ী শ্রমিক অধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব অভিযানে বহু নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনের নেতারা দাবি করেছেন, শিশু ও নারীসহ সাধারণ শ্রমজীবী মানুষদেরও দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা ও মানবিক ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল অনেক ক্ষেত্রে। পাশাপাশি, প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদেরও ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
‘পুশ-ব্যাক’ বিতর্ক
গত এক বছরে বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনায় দেখা গেছে, পরিচয় যাচাইয়ের আগেই কিছু পরিবারকে বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে তদন্তে তাদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ মিললে আবার ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়।
এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের এক গর্ভবতী নারী ও তার পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। একইভাবে মুর্শিদাবাদ ও পূর্ব বর্ধমান জেলার কয়েকজন বাসিন্দাকেও পরে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল।
রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলে প্রশ্ন
মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন,পশ্চিমবঙ্গে প্রকৃতপক্ষে কতজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রয়েছেন, সে বিষয়ে সরকারের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য আছে কি না।
অর্থনীতিবিদ ও কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ বসু তথ্য অধিকার আইনের আওতায় কেন্দ্রের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য চাইলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ জবাব পাননি বলে জানিয়েছেন।
তার মতে, সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ ছাড়া এ ধরনের ব্যাপক অভিযান ও আটক কেন্দ্র গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সীমান্ত রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে হোল্ডিং সেন্টার গঠনের সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কথিত অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
এখন সেই নীতির বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ দেখা হচ্ছে। তবে মানবাধিকার, নাগরিক পরিচয় যাচাই এবং সীমান্ত রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় বিষয়টি আগামী দিনে আরও বড় বিতর্ক তৈরি করতে পারে।






