নওগাঁয় ভূমি সিন্ডিকেট কাণ্ডে তোলপাড়: দুদকের নজরে দুই সহোদর

নওগাঁয় ভূমি কার্যালয়ে দুর্নীতির জাল। দুই ভাইয়ের প্রভাবের অভিযোগ, জাল নামজারি মামলায় ২৪ আসামি—সম্পদ খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
নিজস্ব প্রতিবেদক, নওগাঁ: নওগাঁয় ভূমি খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি ও ঘুষ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে দুই সহোদর কর্মকর্তাকে ঘিরে বিস্তৃত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে জমি নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগে এক ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তাসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে।
একই সঙ্গে অভিযুক্তদের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন, যা বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
রোববার (১৭ মে) নওগাঁর মোকাম ১ নম্বর আমলি আদালতে স্থানীয় আবাসন প্রতিষ্ঠান পিপলস সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মহিউদ্দিন আলমগীর বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় সদর উপজেলার হাঁপানিয়া ও বক্তারপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মেহেদী হাসানকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, শহরের কোমাইগাড়ী এলাকায় আবাসন প্রকল্পের জন্য ক্রয়কৃত জমির একটি অংশ জালিয়াতির মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির নামে নামজারি করে দেওয়া হয়। এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হলে ভুক্তভোগী সমাধান চাইতে গেলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা তার কাছে তিন লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরবর্তীতে আইনি প্রতিকার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি।
বাদীপক্ষের দাবি, নওগাঁর ভূমি খাতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন মৌদুদুর রহমান কল্লোল—তিনি অভিযুক্ত মেহেদী হাসানের বড় ভাই। বর্তমানে তিনি মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ-এনায়েতপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত। পারিবারিক প্রভাব ও প্রশাসনিক সংযোগ কাজে লাগিয়ে এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন অনিয়ম পরিচালনা করে আসছে বলে অভিযোগ ওঠে।
পিপলস সিটির পরিচালক আইনজীবী আতিকুর রহমান বলেন, অতীতে ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে কল্লোল দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমি কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেই সময়েই একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে ওঠে। তার দাবি, এই প্রভাবের কারণে একাধিক অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে দীর্ঘদিন শৈথিল্য দেখা গেছে।
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং তাদের ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের উৎস যাচাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমি কার্যালয়ে পুনরায় পদায়নের তদবিরের অভিযোগও উঠেছে, যা চলমান অনুসন্ধানে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুই ভাই নিজেদের প্রভাবশালী ভূমি পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত করে তুলেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলেও প্রশাসনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অনেকেই অনাগ্রহী বা অক্ষম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিযুক্ত মেহেদী হাসান অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, মামলার বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং কোনো ভুল হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নামজারি বাতিলের সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে মৌদুদুর রহমান কল্লোলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অনাগ্রহ দেখান। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নওগাঁর জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, মামলার অনুলিপি এখনো প্রশাসনের হাতে পৌঁছায়নি। কপি হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান, অর্থের বিনিময়ে বদলির কোনো সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভূমি খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক এই মামলার প্রেক্ষিতে প্রশাসনিক জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।






