ভারতের আগ্রাসী নীতি নিয়ে উদ্বেগ

মানবাধিকার প্রতিবেদনে সীমান্ত হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের চিত্র।
টুইট ডেস্ক: জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাবেক স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর নতুন বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের মানবাধিকার পরিস্থিতি সেই আশাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার প্রকাশিত সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী ভূমিকার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
নির্বাচনে সহিংসতা ও ফলাফল নিয়ে বিতর্ক
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সহিংসতায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং প্রায় ১ হাজার ৩৬৮ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ভোটগ্রহণ তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ছিল, তবে ফলাফল গণনা ও ফলাফল প্রকৌশল নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৬টি আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনের পর বিজয়ী রাজনৈতিক শক্তির সমর্থকদের বিরুদ্ধে পরাজিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও উঠে এসেছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে নির্যাতন
মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম দিক হিসেবে প্রতিবেদনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে নির্যাতনের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে অন্তত চারজন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন নির্যাতনে এবং একজন গণপিটুনিতে নিহত হন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগও বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ২১ জন গণমাধ্যমকর্মীকে তুলে নেওয়ার অভিযোগকে প্রতিবেদনে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারাগার ব্যবস্থাপনাও মানবাধিকার সংকটের বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাবে তিন মাসে ২১ জন বন্দির মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করেছে অধিকার।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬ ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে।
প্রথম প্রান্তিকে অন্তত ৬৪ জন সাংবাদিক হামলা, মামলা ও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ওপর চাপ প্রয়োগের নতুন কৌশল নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
সীমান্তে বিএসএফের তৎপরতা ও ভারতের অপপ্রচার
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপ ও সীমান্তে আগ্রাসী আচরণ নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে অন্তত একজন বাংলাদেশি নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন।
এছাড়া ১৭ জন বাংলাদেশিকে অবৈধভাবে পুশ-ইনের অভিযোগও আনা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তুলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রচারণা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এমনকি ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমান–কে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনি সংস্কার থমকে যাওয়ার অভিযোগ
অধিকার জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশ সংসদে বিল আকারে উত্থাপন না করায় সেগুলো বাতিল হয়ে গেছে। এর মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত অধ্যাদেশও রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও পুরোনো কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর দিকে ফিরে যেতে পারে এবং ন্যায়বিচারের পথ আরও সংকুচিত হতে পারে।
উত্তরণে সুপারিশ
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিচারবহির্ভূত হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা, কারাগারের অব্যবস্থাপনা দূর করা এবং ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে কার্যকর কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়ার সুপারিশ করেছে অধিকার।
বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সফল করতে হলে মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।






