বরিশাল স্কুল মাঠে মেলা বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশ

পরেশ সাগর স্কুল মাঠ রক্ষায় জনস্বার্থের রিটে গুরুত্বপূর্ণ নজির, প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন।

বরিশাল প্রতিনিধি: বরিশাল নগরীর ঐতিহ্যবাহী পরেশ সাগর স্কুল মাঠে মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলার আয়োজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা জনস্বার্থমূলক রিট আবেদনের শুনানি শেষে মেলা কার্যক্রম বন্ধে রুল ও অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের বাইরে রাখার প্রশ্নে এ আদেশকে গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির হিসেবে দেখছেন আইন বিশ্লেষক ও সচেতন মহল।

সোমবার (১৮ মে) হাইকোর্ট বিভাগের ১১ নম্বর মূল বেঞ্চে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মো. আশিফ হাসান–এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রুল ও নির্দেশ দেন। আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ সুবিধা করতে পারেনি।

মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটি–এর চেয়ারম্যান মোঃ আনোয়ার হোসেন আকাশ–এর নির্দেশনায় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ রনি শিকদার গত ১১ মে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট আবেদন দায়ের করেন। মামলাটির নম্বর রিট পিটিশন নং- ৬২৫৯/২০২৬।
রিটকারীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ জাকির হোসেন।

রিটে বলা হয়, সরকারি নীতিমালা ও শিক্ষা পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক নির্দেশনা উপেক্ষা করে বরিশাল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরেশ সাগর স্কুল মাঠ–এ মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলার অনুমতি দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং সামগ্রিক শিক্ষা পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে শব্দদূষণ, যানজট, জনদুর্ভোগ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ও আদালতের নজরে আনা হয়। রিটে উল্লেখ করা হয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের “মেলা পরিপত্র-২০২৪” অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে বাণিজ্য মেলা আয়োজন নীতিমালাবিরোধী। ২৪ জুন ২০২৪ জারি হওয়া পরিপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ছাড়া দেশের অন্য কোথাও বাণিজ্য মেলার ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ ব্যবহার পরিহার করতে হবে।

রিট আবেদনে আরও বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়। পরে আইনজীবীর মাধ্যমে উকিল নোটিশ পাঠিয়েও মেলার অনুমতি বাতিলের দাবি জানানো হয়। গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশের পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।

শুনানি শেষে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি রুল জারি করেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে বাণিজ্য মেলার অনুমতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং কেন সংশ্লিষ্ট অনুমতি বাতিল করা হবে না। একই সঙ্গে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মেলা কার্যক্রম বন্ধ রাখতে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

শুনানিকালে রিটকারীর আইনজীবী আদালতে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ কোনোভাবেই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। এটি শুধু সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী নয়, বরং শিশুদের নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ, উন্মুক্ত খেলাধুলার অধিকার এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

হাইকোর্টের এ নির্দেশনার পর বরিশালজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন আদালতের পদক্ষেপকে সময়োপযোগী বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানকে বাণিজ্যিক ব্যবহার থেকে রক্ষায় এ আদেশ ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় দায়ের করা এ জনস্বার্থমূলক রিট দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ রক্ষা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে তাৎপর্যপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।