প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলেই সংসদ হবে গণতন্ত্রের মাইলফলক

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তাদের অভিমত

টুইট প্রতিবেদক: দেশ ভয়াবহ স্বৈরতন্ত্রের উত্তরাধিকার বহন করছে উল্লেখ করে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, রাজনীতিক ও সংসদ সদস্যরা বলেছেন, রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান কার্যকর ও শক্তিশালী না হলে বর্তমান সংসদকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির মাইলফলক বলা যাবে না। তারা মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে নতুন সংসদকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এগিয়ে যেতে হবে।

রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সিটিজেন ফোরাম বাংলাদেশ (সিএফবি) আয়োজিত ‘বর্তমান জাতীয় সংসদ; গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি নতুন মাইলফলক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

বৈঠকে সংবিধানের মিশ্র প্রয়োগ, রাজনৈতিক সংস্কার, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

সিএফবি চেয়ারম্যান ইমেরিটাস অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ায় সরকার ও বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্যই প্রথমবার সংসদে এসেছেন। তবে যথাযথ রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ ও সদিচ্ছা থাকলে এই সংসদ ভবিষ্যতে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে আংশিকভাবে ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং আংশিকভাবে সংবিধানবহির্ভূত ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে, যা এক ধরনের শংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু সংবিধান সংশোধন করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না; ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করাও জরুরি।

সাবেক মন্ত্রী অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খান সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, আইন ও সংস্কার প্রণয়নই সংসদের প্রধান দায়িত্ব হলেও বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৪ সালের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গঠিত এই সংসদ জনগণের কল্যাণে কাজ করতে সক্ষম হবে।

সভাপতির বক্তব্যে আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক রেনেসাঁ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক সংস্কারের ধীরগতি এখনো বড় বাধা। তিনি জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনে আধুনিক, কর্মমুখী শিক্ষানীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অতীতে একাধিকবার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠিত হলেও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির তৈরি হয়নি। এবার সেই ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার আহ্বান জানান তিনি।

বিশিষ্ট সাংবাদিক এম আবদুল্লাহ বলেন, বর্তমান স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকা ইতিবাচক। তবে সংসদ কতটা জনবান্ধব, তা আগামী বাজেট অধিবেশনের পর স্পষ্ট হবে।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ জেন্ডার বাজেট এবং সংসদীয় কমিটিতে নারীদের দক্ষতাভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, অতীতের বিতর্কিত সংসদগুলোর তুলনায় বর্তমান সংসদ জনগণের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। তবে সংস্কার প্রস্তাব ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়েছে।

সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেন, জনগণের দেওয়া বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের রায় ও স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার এবং সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুমসহ অনেকে।