ভারতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বে বড় পতন

এক দশকে বিধায়ক সংখ্যা কমেছে ৩৩৯ থেকে ২৫৫-এ, বাড়ছে রাজনৈতিক বৈষম্যের আলোচনা।

টুইট প্রতিবেদক: ভারতে গত এক দশকে মুসলিম জনপ্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে বিজেপির শাসনামলে বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায় মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় দেশটির রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৩৯ জন।

বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫৫-এ। অর্থাৎ এক দশকে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কমেছে প্রায় ৮৪টি আসন।

সবচেয়ে বেশি পতন দেখা গেছে উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও রাজস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে।

উত্তর প্রদেশে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৯ শতাংশ হলেও ৪০৩ সদস্যের বিধানসভায় বর্তমানে মুসলিম বিধায়ক রয়েছেন মাত্র ৩১ জন। অথচ আগে এই সংখ্যা ছিল ৬৩।

পশ্চিমবঙ্গেও মুসলিম প্রতিনিধিত্বে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। আগে যেখানে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ছিল ৫৯, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৩৭-এ।

একইভাবে বিহারে ১৯ থেকে ১১ এবং রাজস্থানে ১১ থেকে ৬ জনে কমেছে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৪ সালের পর বিজেপির জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান এবং বিভিন্ন রাজ্যে দলটির সাংগঠনিক বিস্তারের ফলে নির্বাচনী সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে।

বিরোধী দলগুলোও এখন জাতিগত ও আঞ্চলিক সমীকরণকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী মনোনয়ন দিচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ওপর।

সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে বিজেপির প্রার্থী বাছাই নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনে দলটি কোনো মুসলিম প্রার্থী দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও ২০২১ সালের নির্বাচনে এই দুই রাজ্যে মুসলিম প্রার্থী ছিল। আসামে মুসলিম প্রার্থীদের পরাজয়ের পর বিজেপি সেখানে তাদের সংখ্যালঘু সেলও বিলুপ্ত করে।

বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যার তুলনায় বিধানসভায় প্রতিনিধিত্বের ঘাটতিও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ হলেও বিধানসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। আসামে মুসলিম জনসংখ্যা এক-তৃতীয়াংশের বেশি হলেও আসন সংখ্যা প্রায় ১৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এ ছাড়া বিহার, মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকেও মুসলিম প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বর্তমানে ভারতের সাতটি রাজ্যে কোনো মুসলিম বিধায়ক নেই। রাজ্যগুলো হলো,অরুণাচল প্রদেশ, গোয়া, হিমাচল প্রদেশ, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম ও ছত্তিশগড়।

তবে কিছু রাজ্যে ব্যতিক্রমও দেখা গেছে। তামিলনাড়ুতে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ৮ থেকে বেড়ে ৯ হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ ও মেঘালয়েও সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

অন্যদিকে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলক বেশি থাকা জম্মু ও কাশ্মীরেও সংখ্যা ৫৮ থেকে কমে ৫১-এ নেমেছে।

দলীয় অবস্থানের হিসাবে বর্তমানে কংগ্রেসের মুসলিম বিধায়ক সবচেয়ে বেশি, সংখ্যা ৬১। এরপর রয়েছে ন্যাশনাল কনফারেন্স, তৃণমূল কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টি। অন্যদিকে বিজেপির মুসলিম বিধায়ক রয়েছেন মাত্র দুজন,মণিপুরের আছাব উদ্দিন এবং ত্রিপুরার তফাজ্জল হোসেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের এই ধারাবাহিক পতন ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক ও মেরুকরণের জন্ম দিতে পারে।