রবীন্দ্রনাথ: উদ্‌যাপনের আড়ালে অনুপস্থিত এক অস্বস্তিকর চিন্তা

১৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে গান, পোস্টার ও আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে ফিরে আসে রবীন্দ্রনাথ; কিন্তু তাঁর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো কি আজও আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি?

টুইট ডেস্ক: আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনজুড়ে চলছে নানা আয়োজন। মঞ্চে রবীন্দ্রসংগীত, সামাজিক মাধ্যমে উদ্ধৃতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুষ্পস্তবক আর আনুষ্ঠানিক আলোচনা,সব মিলিয়ে আবারও ফিরে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি সত্যিই রবীন্দ্রনাথকে পড়ছি, নাকি কেবল তাঁকে উদ্‌যাপন করছি?

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলা সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ এতটাই মিশে আছেন যে তাঁকে আলাদা করে ভাবাই কঠিন। তবে এই পরিচিতির ভেতরেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের বিভ্রম। আমরা তাঁর গান, কবিতা ও প্রতীককে ধারণ করেছি; কিন্তু তাঁর অস্বস্তিকর রাজনৈতিক, দার্শনিক ও মানবতাবাদী প্রশ্নগুলোকে ক্রমেই সরিয়ে রেখেছি আড়ালে।

রবীন্দ্রসংগীত এখনো টিকে আছে নিখুঁত সুর ও চর্চার ভেতর। তাঁর কবিতার পঙ্‌ক্তি প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। কিন্তু তাঁর “ন্যাশনালিজম”–এর মতো লেখাগুলো আজও সমানভাবে আলোচিত নয়। ১৯১৭ সালে দেওয়া সেই বক্তৃতামালায় রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদকে বলেছিলেন “অশুভের নিষ্ঠুর মহামারি”।

তাঁর ভাষায়, জাতি হলো এমন এক রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংগঠন, যার লক্ষ্য ক্ষমতা ও সমৃদ্ধি।

বিরোধাভাস হলো—যে মানুষ জাতীয়তাবাদের অন্ধ উন্মাদনার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন, তাঁরই লেখা “জন গণ মন” ও “আমার সোনার বাংলা” পরে দুই রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়। অথচ একই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “দেশপ্রেম আমাদের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক আশ্রয় হতে পারে না; আমার আশ্রয় মানবতা।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি, ধর্মীয় মেরুকরণ ও রাষ্ট্রীয় প্রচারণার যুগে রবীন্দ্রনাথের এই সতর্কবাণী নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। জাপানে জাতীয়তাবাদ নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, রাষ্ট্র শিক্ষা ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের অনুভূতি “তৈরি” করে এবং সবাইকে একরকম মানসিক কাঠামোয় ঢেলে দিতে চায়। এক শতাব্দী পরও সেই ভাষা বিস্ময়করভাবে সমকালীন।

এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে গভীরভাবে ধরা পড়ে তাঁর উপন্যাস গোরা–এ। সেখানে একদিকে পরিচয়কে দেখা হয়েছে নিরাপত্তা হিসেবে, অন্যদিকে সেটিকেই আবার সংকীর্ণতার কারাগার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মানবিক সংযোগ বনাম পরিচয়ের প্রাচীর,এই টানাপোড়েনই যেন রবীন্দ্রচিন্তার কেন্দ্র।

একইভাবে “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য” কবিতাটিও এখন প্রায় আনুষ্ঠানিক উচ্চারণে সীমাবদ্ধ। কিন্তু “জ্ঞান যেথা মুক্ত” এই পঙ্‌ক্তি কেবল সাহস নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার দাবি তোলে। এমন এক সমাজের আহ্বান জানায়, যেখানে ভয়, অন্ধ অনুকরণ ও মানসিক দাসত্ব থাকবে না।

শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও রবীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল ব্যতিক্রমী। বিস্ব ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি এমন শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা কেবল তথ্য দেয় না; মানুষকে বিশ্ব ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে। অথচ আজও দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষা-কেন্দ্রিকতা ও মানসিক একরৈখিকতার মধ্যেই আবদ্ধ।

নারী চরিত্র নির্মাণেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সময়ের চেয়ে অগ্রসর। স্ত্রী পত্র–এর মৃণাল কেবল সংসার ছাড়েন না, তিনি আনুগত্যের সংস্কৃতিকেই প্রত্যাখ্যান করেন। ঘরে বাহিরে,এ জাতীয়তাবাদকে দেখানো হয়েছে নৈতিক সংকট ও বিভাজনের উৎস হিসেবে।

সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, আজকের ডিজিটাল যুগ রবীন্দ্রনাথকে আরও বেশি “উদ্ধৃতিযোগ্য” করে তুলেছে, কিন্তু কমিয়ে দিয়েছে গভীর পাঠ। তাঁর লাইনগুলো সামাজিক মাধ্যমে অনুপ্রেরণামূলক বাক্যে পরিণত হচ্ছে; অথচ পেছনের রাজনৈতিক ও দার্শনিক তর্কগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।

“একলা চলো রে”–ও আজ প্রায় ব্যক্তিসাফল্যের স্লোগান। অথচ গানটির অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল নৈতিক নিঃসঙ্গতার সাহস,যখন সমাজ নীরব, তখনও সত্যের পথে অবিচল থাকা।

জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে বিশ্বযুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সভ্যতার সংকেত–এ তিনি লিখেছিলেন, “মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।” আজ এই লাইন প্রায় আবেগঘন উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল সভ্যতার সংকটময় মুহূর্তে উচ্চারিত এক প্রতিরোধের ভাষা।

রবীন্দ্রনাথ তাই আজও বেঁচে আছেন,কিন্তু আংশিকভাবে। তাঁর গান আছে, প্রতিকৃতি আছে, স্মরণসভা আছে। কিন্তু সংগঠিত ক্ষমতা, অন্ধ জাতীয়তাবাদ, মানসিক একরৈখিকতা ও সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে যে কঠিন রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন তুলেছিলেন, তিনি এখনো অপেক্ষা করছেন গভীর পাঠ ও সৎ বিতর্কের।