মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংকট: ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধে উত্তেজনা চরমে

১২ দিনে তীব্র হামলা-পাল্টা হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংকট!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–ইসরায়েল সংঘাত ক্রমেই বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর পর সংঘাত এখন কার্যত যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল বনাম ইরান সামরিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বুধবার (১১ মার্চ) পর্যন্ত প্রায় ১১ থেকে ১২ দিন ধরে চলমান।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধটি এখন “ক্ষয়যুদ্ধ” পর্যায়ে প্রবেশ করেছে—যেখানে উভয় পক্ষ ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

তেহরানে তীব্র বোমাবর্ষণ

গত কয়েক দিনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশ ধ্বংস করা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ৪০০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।

তেহরানে সাম্প্রতিক এক রাতের হামলাকে যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র বোমাবর্ষণের একটি হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই হামলায় তেল শোধনাগার, তেল সংরক্ষণাগার, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ঘাঁটি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

কিছু স্থানে তেল স্থাপনায় আগুন লাগার পর বিষাক্ত ধোঁয়া ও কালো বৃষ্টির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা

অন্যদিকে ইরানও ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে একাধিক দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কয়েক দিনে ৮ থেকে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যারেজ চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই হামলায় ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে অন্তত দুইজন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। একই সময়ে লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ১৬ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতে সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো।

নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক ও গুজব

যুদ্ধের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হয়েছেন—এমন দাবি ইসরায়েলি কিছু সূত্রে প্রচারিত হলেও বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে ইরানের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের গুঞ্জন জোরালো হয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, অভিযান এখনও শেষ হয়নি এবং সামনে আরও “অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ” আসতে পারে।

হতাহত ও মানবিক সংকট

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়ে গেছে বলে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে। ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৪০ সেনা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

এদিকে লেবাননে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় সেখানে ৭ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ

সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয়।

নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার পারস্য উপসাগরে অপেক্ষা করছে, ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এখন দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে চাইলেও ইরান বলছে, তারা কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করবে না এবং প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।

পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার—দুটোই এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।