মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ধাক্কা, চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি

জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ; রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও সরবরাহব্যবস্থায় বাড়ছে ঝুঁকি।
টুইট ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস উৎপাদনের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোও হামলার শিকার হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৮০ মার্কিন ডলারের উপরে উঠেছে এবং কোনো কোনো সময়ে ৯০ ডলারও অতিক্রম করেছে। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৮ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বছরে অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। ফলে আমদানি বিল বৃদ্ধি পেয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও এই সংঘাতের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দেশের মোট জ্বালানির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে তেল এবং কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেশি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
ইতোমধ্যে কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের খবর পাওয়া গেছে। ফলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত বাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে, যা জ্বালানি আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, পাশাপাশি পরিবহন খরচ এবং শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া রপ্তানি খাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় এবং জাহাজের বীমা খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। এতে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়তে পারে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন।
শিপিং ব্যয় ও বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রবাহেও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপমুখী বাণিজ্যপথে জাহাজ চলাচলে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় পরিবহন ব্যয় আরও বাড়ছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলে শিল্প খাতে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছে এবং পেট্রোল পাম্পে সরবরাহ সীমিত করার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে দেশে জ্বালানি মজুত প্রায় দুই থেকে চার সপ্তাহের মতো রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন, যাদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আকাশপথে ফ্লাইট বাতিল, কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও চাপে পড়েছে। উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং জরুরি জ্বালানি ক্রয়ের কারণে রিজার্ভ দ্রুত হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন।
তবে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজার চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য বাজার থেকে ডিজেল ও গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সংবাদদাতা তানভির চৌধুরী ঢাকা থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স, এএফপি, আল জাজিরা, বিবিসি, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও সংশ্লিষ্ট সরকারি বিবৃতি।






