ইসিতে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ জামায়াত–বিএনপির

ভোটের পরিবেশ, আচরণবিধি, শান্তি কমিটি ও ভোটার স্থানান্তর নিয়ে বিএনপির অভিযোগের পাল্টা জবাব জামায়াতের; নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

টুইট ডেস্ক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটের পরিবেশ, আচরণবিধি ও সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি। রোববার (০১ ফেব্রুয়ারি) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠকে এসব অভিযোগ তুলে ধরে দুই দল।

বিএনপির অভিযোগ ও দাবি

বিএনপির অভিযোগ, নির্বাচনের বিভিন্ন এলাকায় ‘শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার’ নামে একটি দল শান্তি কমিটি গঠনের আলোচনা চালাচ্ছে। পাশাপাশি ভোটের প্রচারে ধর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে এবং গত এক থেকে দেড় বছরে ঢাকা মহানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক হারে ভোটার স্থানান্তর হয়েছে বলেও অভিযোগ করে দলটি।

এ ছাড়া ভোটের কাজে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) যুক্ত না করা এবং ভোটের আগে বহিরাগতদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় বিএনপি।

রোববার সকালে নির্বাচন ভবনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল সিইসির সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, তারা জানতে পেরেছেন, প্রথমবারের মতো বিএনসিসির ক্যাডেটদের নির্বাচনের কাজে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, বিএনসিসির ক্যাডেটরা ছাত্র; সংসদ নির্বাচনের মতো জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তরুণ শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা ঠিক হবে না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, একবার এটি হলে পরে স্কাউট, গার্লস গাইডদেরও যুক্ত করার দাবি উঠতে পারে। বিএনপির মতে, আইনে যাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, কেবল তাদেরই নির্বাচনের কাজে রাখা উচিত। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন তাদের যুক্তির যৌক্তিকতা স্বীকার করেছে এবং আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানান তিনি।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, কোনো কোনো দলের পক্ষ থেকে শান্তি কমিটি গঠনের কথা শোনা যাচ্ছে, যা বিএনপির কাছে অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, ‘শান্তি কমিটি’ শব্দটি তাদের কাছে অপ্রিয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

ভোটার স্থানান্তর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত এক থেকে দেড় বছরে বিশেষ কিছু এলাকায় অস্বাভাবিকভাবে অনেক নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে। যদিও ইসি বলছে, কোনো আসনে দুই–তিন হাজারের বেশি ভোটার স্থানান্তর হয়নি, তবে বিএনপি এতে সন্তুষ্ট নয়। নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, ইসিকে সঠিক তথ্য দেওয়া হয়নি এবং প্রকৃতপক্ষে অনেক বেশি ভোটার মাইগ্রেশন হয়েছে। তিনি আসনভিত্তিক তথ্য চেয়েছেন এবং সন্দেহজনক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কিছু হোল্ডিংয়ে ৪–৫ জন বসবাস করলেও সেখানে ২০–৩০ জন ভোটার থাকার অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ইসি তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, নির্বাচনী প্রচারে এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে যা শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আবেগেও আঘাত করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি কবরের প্রশ্ন নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে ইসি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। আচরণবিধি প্রতিপালনে বিচারিক অনুসন্ধান কমিটির ভূমিকা আরও দৃশ্যমান করার দাবি জানান বিএনপির এই নেতা।

ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে বহিরাগতদের নির্বাচনি এলাকা ছাড়ার বিষয়েও ইসির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিএনপি। নজরুল ইসলাম খান বলেন, কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় কাজ করছেন। আইনগত বাধা না থাকলেও, তারা যেন ভোটের দুদিন আগে ওই এলাকায় না থাকে—এমন অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া দেশীয় ৮১টি সংস্থার ৫৫ হাজারের বেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক অনুমোদনের বিষয়েও প্রশ্ন তোলে বিএনপি। নজরুল ইসলাম খান বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান তেমন পরিচিত নয়, অথচ তাদের নামে অনেক পর্যবেক্ষক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে নির্বাচনী কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে—এমন সংস্থার পর্যবেক্ষকদেরই মাঠে থাকা উচিত।

জামায়াতে ইসলামির বক্তব্য

বিএনপির পর রোববার বিকেলে জামায়াতে ইসলামির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল সিইসির সঙ্গে বৈঠক করে। প্রতিনিধি দলে নারী প্রতিনিধিরাও ছিলেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে ‘শান্তি কমিটি’ প্রসঙ্গে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, এসব আজগুবি অভিযোগ কোনো সুস্থ মাথা থেকে আসতে পারে না। তিনি দাবি করেন, জনগণের নারী–পুরুষ নির্বিশেষে ব্যাপক সমর্থন জামায়াতের দিকে থাকায় একটি দল অস্থির হয়ে এসব কথা বলছে। ঢাকায় হাদি হত্যা ও শেরপুরে রেজাউল হত্যাকাণ্ডকে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য ‘মারাত্মক অন্তরায়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপির অন্যান্য অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি দল সবকিছুতেই ‘না’ বলে। গণভোটেও তারা ‘না’-এর পক্ষে ছিল, এখন হয়তো ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এসেছে—এটি জনগণই বিচার করবেন।

জামায়াতে ইসলামির নারী উইংয়ের প্রধান হাবিবা চৌধুরী বলেন, দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৫০ শতাংশ নারী হলেও দীর্ঘদিন ধরে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। তাঁর অভিযোগ, আসন্ন নির্বাচন নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাদের ভয় দেখিয়ে ভোট থেকে দূরে রাখার চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, জামায়াত সংশ্লিষ্ট নারী কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১৫টি ঘটনার তথ্য নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মানববন্ধন

এদিকে মাঠপর্যায়ে যাতায়াত ও খাবার ভাতা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে রোববার (০১ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনে মানববন্ধন করেছে ইলেকশন অবজারভার সোসাইটি (ইওএস)। মানববন্ধন শেষে সংগঠনের নেতারা সিইসি বরাবর স্মারকলিপি দেন।

ইওএস নেতারা জানান, এবারের নির্বাচনে কমিশন প্রায় ৫৫ হাজার স্থানীয় পর্যবেক্ষকের তালিকা অনুমোদন দিয়েছে, যার মধ্যে তাদের অধীনে রয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার পর্যবেক্ষক। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য বড় বাজেট থাকলেও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের জন্য কোনো আর্থিক সহায়তা না থাকাকে তারা বৈষম্যমূলক বলে উল্লেখ করেন।

তাদের তিন দফা দাবি হলো—মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষকদের জন্য ন্যূনতম যাতায়াত, থাকা ও খাবারের ব্যয় নির্বাহে জরুরি তহবিল বরাদ্দ; দায়িত্ব পালনকালে বাধা বা আক্রমণকে বেআইনি ঘোষণা করে দ্রুত পরিপত্র জারি; এবং অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা নিরসনে সময়সীমা বাড়িয়ে অফলাইনে পরিচয়পত্র ও স্টিকার সংগ্রহের ব্যবস্থা করা।

পোস্টাল ব্যালটের হালনাগাদ

এদিকে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটদান সম্পন্ন করে প্রবাসীরা ব্যালট পাঠানো শুরু করেছেন। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টা পর্যন্ত ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯৮টি পোস্টাল ব্যালট বাংলাদেশে পৌঁছেছে।

আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্পের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সালীম আহমাদ খান জানান, ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করা ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২ জন প্রবাসী ভোটারের ঠিকানায় ব্যালট পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ২০ হাজার ৫০১ জন ব্যালট গ্রহণ করেছেন এবং ৪ লাখ ৬১ হাজার ৬০৪ জন ভোট প্রদান সম্পন্ন করেছেন।

তিনি আরও জানান, ৪ লাখ ১৫ হাজার ৭৬২টি পূরণকৃত ব্যালট সংশ্লিষ্ট দেশের পোস্ট অফিস বা ডাকবাক্সে জমা দেওয়া হয়েছে এবং এরই মধ্যে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯৮টি ব্যালট দেশে পৌঁছেছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সালীম আহমাদ খান জানান, দেশে ও প্রবাসে মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তর থেকে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪২ জন, যার মধ্যে আইনি হেফাজতে থাকা ভোটার রয়েছেন ৬ হাজার ২৪০ জন।

গত ২৬ জানুয়ারি থেকে দেশে নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারদের উদ্দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো শুরু হয়। রোববার (০১ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত এ প্রক্রিয়ায় মোট ৫ লাখ ৮০ হাজার ৯৬৮টি পোস্টাল ব্যালট প্রেরণ করা হয়েছে।

সূত্র: আমারদেশ