৭ নভেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বিশ্লেষণ

সিপাহী-জনতার বিপ্লব, জিয়াউর রহমানের মুক্তি, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রথম আলোতে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ।
নিজস্ব প্রতিবেদক: ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
তাঁর মতে, এই দিনের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়েছিল।
শনিবার (৭ নভেম্বর) দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘৭ নভেম্বর ১৯৭৫ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়’ শিরোনামের এক নিবন্ধে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন।
নিবন্ধে সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ৩ নভেম্বরের সেনা অভ্যুত্থান, তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের গৃহবন্দিত্ব এবং ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের ধারাবাহিক ঘটনা বিশ্লেষণ করেন।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের মুখে পড়ে। তাঁর মূল্যায়নে, তৎকালীন সরকারের শাসননীতি, দুর্নীতি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, একদলীয় শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছিল।
সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, এসব পরিস্থিতি সিপাহী-জনতার বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। তিনি ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন।
৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমানের গৃহবন্দিত্ব
নিবন্ধে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ দেখা দেয় এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে তাঁর বাসভবনে গৃহবন্দি করা হয়।
তিনি দাবি করেন, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল।
এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘Bangladesh: A Legacy of Blood’ এবং অন্যান্য গবেষণাধর্মী গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন তিনি।
সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও জিয়াউর রহমানের মুক্তি
নিবন্ধে বলা হয়, ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত থেকে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে অভ্যুত্থান শুরু হয়। একপর্যায়ে সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর লেখায় দাবি করেন, জিয়াউর রহমানের মুক্তির পর সেনাসদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসে। সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সংহতির পরিবেশ তৈরি হয়। ট্যাংক ও সামরিক যান নিয়ে মানুষের উল্লাস এবং বিভিন্ন স্লোগানের মধ্য দিয়ে সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্ম দেয়।
এ প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ হামিদের ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ এবং গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ‘ইতিহাসের বাঁকবদল, একাত্তর ও পঁচাত্তর’ গ্রন্থের উদ্ধৃতিও ব্যবহার করেছেন লেখক।
স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও পররাষ্ট্রনীতি
সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর নিবন্ধে ৭ নভেম্বরের বিপ্লবকে আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তাঁর মতে, জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসে। ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির ভিত্তিতে মুসলিম বিশ্ব, চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি মনে করেন, এসব উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রেখেছিল।
সামরিক আইন প্রশাসক থেকে রাষ্ট্রপতি
নিবন্ধে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রক্ষমতায় উত্থানের ধারাবাহিকতাও তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, ৭ নভেম্বরের পর তিনি উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
এ ছাড়া ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর বিজয়ের বিষয়টিও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকের মতে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান তাঁর শাসনব্যবস্থাকে বেসামরিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোয় রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেন।
বিএনপি প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ
সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর নিবন্ধে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ দেশের ভৌগোলিক সীমানা, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয় পরিচয়ের সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠার ধারণা সামনে নিয়ে আসে।
তিনি বিএনপিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া বিএনপির ১৯ দফা কর্মসূচি, কৃষি উন্নয়ন, খাল খনন, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান
নিবন্ধে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
বিশেষ করে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) সঙ্গে সম্পর্ক, আল-কুদস কমিটিতে ভূমিকা, ইরান-ইরাক যুদ্ধের মধ্যস্থতার উদ্যোগ এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক প্রতিষ্ঠার ধারণার পেছনে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তুলে ধরেছেন লেখক।
তাঁর মতে, কৃষি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জনের পথে এগিয়ে যায়।
৫১ বছর পূর্তিতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
নিবন্ধের শেষাংশে সালাহউদ্দিন আহমদ ৭ নভেম্বরের ৫১ বছর পূর্তিতে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্য রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
তিনি মনে করেন, দেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য এবং স্বনির্ভরতা অপরিহার্য। নতুন প্রজন্মের কাছে ৭ নভেম্বরের ইতিহাস ও তাৎপর্য তুলে ধরার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
নিবন্ধের সমাপ্তিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কর্ম ও অবদান স্মরণ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সূত্র: সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য।






