এনসিপি-জামায়াত জোটে ফাটল, বিচ্ছেদের আলোচনা

টুইট ডেস্ক : ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্যের ভেতরে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী সমঝোতা নিয়ে দুই দলের মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসায় জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এনসিপির একাংশ জামায়াতের সঙ্গে জোট ছাড়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনই বিচ্ছেদের কথা স্বীকার করছে না।
এনসিপির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সমঝোতার ভিত্তিতে অংশ নিতে আগ্রহী দলটি। তবে জামায়াত প্রতিটি শরিক দলকে পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ নিয়ে দুই দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এনসিপির অনেক নেতা মনে করছেন, জোটে থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে দলটির স্বতন্ত্র পরিচয় ও সাংগঠনিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দলটির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক পার্থক্যের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে দুই দলের অবস্থানের ভিন্নতা এনসিপির জন্য রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করছে। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকার কারণে সাধারণ মানুষের একটি অংশ এনসিপিকে একই রাজনৈতিক পরিচয়ে মূল্যায়ন করছে বলেও মনে করছেন দলটির নেতারা।
জোটের ভেতরে দূরত্বের বিষয়টি নতুন নয়। সংসদের প্রথম অধিবেশনে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) বিল নিয়ে দুই দলের অবস্থানের পার্থক্য প্রকাশ্যে আসে। ওই বিলে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে জামায়াতের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জামায়াত আপত্তি জানালেও এনসিপির সংসদ সদস্যরা লিখিতভাবে বিলটির প্রতি সমর্থন জানান। এতে জামায়াতের নেতাদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ ও যৌথ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাত্রা কমেছে। গত শনিবার ঢাকা-খুলনা লংমার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়। যদিও জোটের কয়েকজন নেতা নিরাপত্তাজনিত কারণকে এর পেছনে দায়ী করেছেন, তবে বিষয়টি দুই দলের দূরত্বের আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধের সবচেয়ে বড় প্রকাশ ঘটেছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে। এনসিপি ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী উত্তরে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে একই নির্বাচনে দুই দলের আলাদা প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
এনসিপির এক যুগ্ম আহ্বায়কের দাবি, দলটির ভেতরে জামায়াতের সঙ্গে জোট ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। নিজেদের আদর্শ ও রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে স্বতন্ত্রভাবে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে অধিকাংশ নেতা মত দিচ্ছেন। জোটের কর্মসূচি ও বৈঠকে অংশগ্রহণ সীমিত করার পাশাপাশি একক কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
তবে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার জোট ভাঙার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, জোট আগের মতোই রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিটি দল এককভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভবিষ্যতে নির্বাচনি সমঝোতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকলেও আপাতত এনসিপি নিজেদের শক্তিতে নির্বাচনে ভালো ফল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জামায়াতের নেতারাও জোটে কোনো সংকট নেই বলে দাবি করছেন। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, স্থানীয় নির্বাচনে কোনো দলের সঙ্গে সমঝোতা না করে প্রত্যেকে নিজস্বভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিমও দুই দলের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্বের কথা অস্বীকার করেছেন।
এদিকে এনসিপি নিজেদের সাংগঠনিক বিস্তার বাড়াতে পৃথক কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে। চার দফা দাবিতে দেশের বিভিন্ন মহানগরে বিক্ষোভ সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও দলটির পক্ষ থেকে মেয়র প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও বাড়তে পারে।
দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে এনসিপি ‘হিন্দু অ্যালায়েন্স’ নামে একটি পৃথক উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। নভেম্বরের শেষ দিকে এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক প্রীতম দাশ জানিয়েছেন, এ উদ্যোগ নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে এবং সারা দেশের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে, ১১ দলীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শরিকদের পারস্পরিক অবস্থান ও রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর। সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় ইস্যুতে একসঙ্গে আন্দোলন করলেও স্থানীয় নির্বাচনে আলাদা অবস্থান জোটের সাংগঠনিক সংহতিকে কতটা প্রভাবিত করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। এনসিপি শেষ পর্যন্ত জোটে থাকবে, নাকি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পথ বেছে নেবে, তা নির্ধারিত হতে পারে আগামী দিনের নির্বাচনি কৌশল ও দলীয় সিদ্ধান্তে।






