বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার-২৩: ডিসেম্বরের অপেক্ষা নয়, এখনই আবেদন করার পরামর্শ

বিশেষ এক্সিট সুবিধায় এককালীন মূলধন পরিশোধে সুদ মওকুফের সুযোগ; পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনসহ প্রক্রিয়াগত জটিলতা বিবেচনায় দ্রুত আবেদনের আহ্বান ব্যারিস্টার কামরুজ্জামানের।

টুইট প্রতি‌বেদক: বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় ও নিষ্পত্তির বিশেষ উদ্যোগের আওতায় জারি করা সার্কুলার-২৩-এর সুবিধা নিতে ঋণগ্রহীতাদের শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দ্রুত আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মৌলিক অধিকার কর্মী ব্যারিস্টার মোঃ কামরুজ্জামান।

তিনি বলেছেন, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বিশেষ এক্সিট সুবিধার সময়সীমা থাকলেও আবেদন প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনসহ একাধিক ধাপ রয়েছে। ফলে নভেম্বর বা ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করলে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৯ জুন ২০২৬ তারিখে BRPD-১ সার্কুলার লেটার নং-২৩ জারি করে খেলাপি ঋণ আদায় ও নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ওয়ান টাইম এক্সিট (Special Exit) সুবিধা চালু করে। সার্কুলারটির ইংরেজি নাম ‘Special Exit Policy for Recovery/Settlement of Loans’। এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ (NPL) কমানো, ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান উন্নত করা এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো। এ সুবিধার কার্যকারিতার নির্ধারিত সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬।

এক ভিডিওবার্তায় ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান বলেন, অনেক ঋণগ্রহীতা মনে করছেন ডিসেম্বর মাসে কিংবা একেবারে শেষ মুহূর্তে আবেদন করলেও সমস্যা হবে না। কিন্তু এই ধারণা ভুল। কারণ সার্কুলারে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ নিয়মিত প্রতিদিন বসে না; সাধারণত মাসে একবার কিংবা কখনো দুই মাসে একবার সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে। ফলে শেষ মুহূর্তে আবেদন করলে সেটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপনের সুযোগ নাও থাকতে পারে।
তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে শেষ মুহূর্তে কাজ করার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু সুদ মওকুফের এমন সুযোগ বাংলাদেশে খুব কম এসেছে। সার্কুলার-২৩-এর মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের জন্য যে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে ভেবে বসে থাকলে নিজেদের সম্ভাবনা নষ্ট হতে পারে।
কারা পাবেন বিশেষ এক্সিট সুবিধা

সার্কুলার-২৩-এর শর্ত অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তি তারিখে যেসব ঋণ মন্দ (Bad) ও ক্ষতিজনক (Loss) শ্রেণিতে শ্রেণিকৃত হয়েছে, সেসব ঋণ এই সুবিধার আওতায় আসবে। এ ছাড়া ৬ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে পুনঃতফসিলকৃত মন্দ ও ক্ষতিজনক শ্রেণির ঋণও এ সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হবে।

বিশেষ এই সুবিধার আওতায় ঋণগ্রহীতাকে এককালীন (Lump-sum) পুরো বকেয়া মূলধন পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ মূলধন পরিশোধের ক্ষেত্রে কিস্তিতে অর্থ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আরোপিত (Charged) ও অনারোপিত (Uncharged) সুদ মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। আগের কিছু কঠোর শর্তও শিথিল করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তহবিলের খরচ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করার শর্ত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের আয় হিসাব থেকে সুদ মওকুফ না করার বাধ্যবাধকতার মতো বিষয়।
তবে সুদ মওকুফ স্বয়ংক্রিয় নয়। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ঋণগ্রহীতা ও ব্যাংকের মধ্যকার সম্পর্ক এবং ঋণগ্রহীতার ব্যবসা পরিচালনা অব্যাহত রাখার সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

সার্কুলারে কৃষি খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং CMSME (কটেজ, মাইক্রো ও স্মল এন্টারপ্রাইজ) খাতের ঋণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আবেদন থেকে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন: চারটি ধাপ
ব্যারিস্টার কামরুজ্জামানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিশেষ এক্সিট সুবিধার আবেদন জমা দেওয়ার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে হবে। প্রক্রিয়াটি হলো—
১. ঋণগ্রহীতা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শাখায় আবেদন জমা দেবেন।
২. শাখা আবেদনটি প্রক্রিয়াকরণ করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠাবে।
৩. ব্যবস্থাপনা পরিচালক (Managing Director) আবেদনটি পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করবেন।
৪. পরিচালনা পর্ষদ আবেদন পর্যালোচনা করে অনুমোদন বা নামঞ্জুরের সিদ্ধান্ত নেবে।

তাঁর মতে, শুধু ৩১ ডিসেম্বরের আগে শাখায় আবেদন জমা দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। আবেদনটি ওই সময়সীমার আগে পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে জমা দিতে হবে। কারণ পরিচালনা পর্ষদের সভা না হলে বা আবেদনের প্রক্রিয়া যথাসময়ে সম্পন্ন না হলে ঋণগ্রহীতার আবেদন বিফলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিসেম্বর নয়, নভেম্বরও নয়—এখনই আবেদনের তাগিদ
আবেদনের সময় নিয়ে ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান বলেন, ডিসেম্বরের অপেক্ষা করা যাবে না, এমনকি নভেম্বর মাসেও আবেদন করার জন্য অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। কারণ শাখা থেকে প্রধান কার্যালয়ে আবেদন পাঠানো, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপন এবং অনুমোদন বা নামঞ্জুরের সিদ্ধান্ত পেতে সময় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আবেদন করার উপযুক্ত সময় এখনই। সম্ভব হলে আজ, আগামীকাল কিংবা এক-দুই দিনের মধ্যেই আবেদন জমা দিতে হবে। যত বেশি সময়ক্ষেপণ করা হবে, আবেদনটি যথাসময়ে প্রক্রিয়াকরণের সম্ভাবনা তত কমবে। একই সঙ্গে আবেদনে ভুল থাকলে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে।
ব্যাংকে আবেদন নামঞ্জুর হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও হাইকোর্টে যাওয়ার সুযোগ

ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান বলেন, আবেদনটি পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপনের পর যদি নামঞ্জুর হয়, তাহলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রাখতে হবে। সেখানেও প্রতিকার না পাওয়া গেলে প্রয়োজনে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে হতে পারে।

তাঁর মতে, ব্যাংকের শাখায় আবেদন, প্রধান কার্যালয়ে প্রক্রিয়াকরণ, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিকার চাওয়া এবং প্রয়োজনে হাইকোর্টে রিট দায়ের—প্রতিটি ধাপেই সময়ের প্রয়োজন রয়েছে। তাই শেষ মুহূর্তে আবেদন করলে পরবর্তী আইনি প্রতিকারের সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে নির্ভুল আবেদন করার পরামর্শ

আবেদনের সময়ের পাশাপাশি এর যথার্থতার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ব্যারিস্টার কামরুজ্জামানের পরামর্শ, তাড়াহুড়া করে কিংবা ভুল তথ্য দিয়ে আবেদন করা যাবে না। অভিজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তায় আবেদন তৈরি করতে হবে, যাতে প্রয়োজনীয় তথ্য, কাগজপত্র, আইনগত ভিত্তি ও প্রক্রিয়াগত শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়।
তিনি জানান, আগের ভিডিওতেও আবেদনের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতারা যেসব সাধারণ ভুল করেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। ওই ভিডিও দেখে ভুলগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন তিনি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আবেদনটি সংশ্লিষ্ট সার্কুলারের পরিধির মধ্যে, আইনসম্মতভাবে এবং সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তৈরি করতে হবে। ভুল আবেদন বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্রের কারণে ঋণগ্রহীতার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সময় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, তবে নিশ্চয়তা নেই
ভিডিওবার্তায় ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান জানান, সার্কুলার-২৩-এর কার্যকারিতার সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে বাড়ানোর জন্য তাঁরা চেষ্টা করছেন। তবে সেই চেষ্টা সফল হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

তিনি বলেন, যদি ৩১ ডিসেম্বরই শেষ সময় হিসেবে বহাল থাকে, তাহলে শেষ মুহূর্তে আবেদন করার অভ্যাসের কারণে কেউ যেন এই সুযোগ হারিয়ে না ফেলেন। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শেষ সময়ে আবেদন করার যে প্রবণতা রয়েছে, বিশেষ এই সুযোগের ক্ষেত্রে তা পরিহার করতে হবে।

ব্যাংকগুলোকে যোগ্য গ্রাহকদের অবহিত করার বিষয়
সার্কুলার-২৩-এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে যোগ্য ঋণগ্রহীতাদের চিঠির মাধ্যমে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনার বিষয়টিও রয়েছে। ফলে এ সুবিধার আওতাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন ঋণগ্রহীতাদের নিজেদের ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

ঋণগ্রহীতাদের প্রতি পরামর্শ

যারা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ওয়ান টাইম এক্সিট সুবিধা নিতে চান, তাদের আর দেরি না করে নিজ নিজ ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান। পাশাপাশি আবেদনটি অভিজ্ঞ আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির মাধ্যমে নির্ভুলভাবে প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

সার্কুলার-২৩ খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের জন্য এককালীন মূলধন পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তি এবং সুদ মওকুফের একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এ সুবিধা স্বয়ংক্রিয় নয়; ব্যাংকের মূল্যায়ন ও পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন। তাই নির্ধারিত সময়সীমার পাশাপাশি আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ বিবেচনায় রেখে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বক্তার পরিচয় ও যোগাযোগ

ব্যারিস্টার মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮০১৭৭১-৫৯৯৫৭৭
ইমেইল: [email protected]

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের BRPD-১ সার্কুলার লেটার নং-২৩, ২৯ জুন ২০২৬ এবং ব্যারিস্টার মোঃ কামরুজ্জামানের ভিডিওবার্তা।