এইচএসসির ফল নিয়ে প্রশ্ন তুললেন শিক্ষক মোস্তাক শরীফ

সৃজনশীলতা ও দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা; পরীক্ষার ফল দিয়ে মেধা মূল্যায়নের সংস্কৃতি পরিবর্তনের আহ্বান শিক্ষক মোস্তাক শরীফের।
টুইট ডেস্ক: ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়ার পর দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক, অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক মোস্তাক শরীফ। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের মেধা ও যোগ্যতা মূল্যায়নে শুধু জিপিএ-নির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত মান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
গত কয়েক বছরের ফলাফলের তুলনায় এবার পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৪ দশমিক ৩১, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ৬৪, ২০২৪ সালে ৭৭ দশমিক ৭৮ এবং ২০২৫ সালে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
মোস্তাক শরীফের মতে, ফলাফলের এই নিম্নমুখী প্রবণতাকে শুধু শিক্ষার্থীদের মেধার অবনতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রচলিত পদ্ধতি কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের পারফরম্যান্স তাঁকে হতাশ ও শঙ্কিত করে। বিশেষ করে ভালো ফল নিয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রয়োজনীয় সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও মৌলিক জ্ঞানের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
এবারের পরীক্ষায় ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টিও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ইংরেজি একমাত্র সফলতার মাপকাঠি নয়। তবে উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে ভাষাটির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই শিক্ষক। তাঁর মতে, কয়েক দশকে একের পর এক নতুন পাঠ্যক্রম, পরীক্ষামূলক পদ্ধতি ও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি চালু হলেও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। দেশের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও বিশ্বপরিস্থিতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান ও আগ্রহের ঘাটতিও উদ্বেগজনক।
লেখায় জিপিএ-নির্ভর সামাজিক মূল্যায়নের সংস্কৃতির সমালোচনা করে মোস্তাক শরীফ বলেন, পরীক্ষার ফলকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মেধার বিচার করা এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের বিশেষভাবে উদ্যাপন করার বিপরীতে অন্যদের ছোট করে দেখার প্রবণতা তরুণদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশেষ করে ১৮-১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে থাকে। এ সময় পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কটূক্তি কিংবা নেতিবাচক মন্তব্য তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে। কখনো তা গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের কারণও হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন এই শিক্ষক। তাঁর মতে, সন্তান জিপিএ-৫ না পেলেও তার চেষ্টা, পরিশ্রম ও সম্ভাবনাকে সম্মান জানানো উচিত। পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
লেখাটির শেষাংশে তিনি এক বন্ধুর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। ওই বন্ধুর ছেলে জিপিএ-৫ না পেলেও তাকে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন বাবা। তাঁর বিশ্বাস, একদিন সন্তান জিপিএ-৫ পাওয়ার চেয়েও বড় কোনো অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে।
মোস্তাক শরীফের মতে, সন্তানদের ওপর অযৌক্তিক প্রত্যাশার চাপ না দিয়ে তাদের প্রচেষ্টা ও অর্জনকে উদ্যাপন করাই অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। জিপিএ-৫-এর প্রতিযোগিতার বাইরে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও শিক্ষার্থীদের মানবিক বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।






