মানিক পশারীর কবর খুঁড়তে ছিলেন দুই পুরুষও

তিন নারীর কবর খোঁড়ার ছবি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা; কবর ভরাট ও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার জামায়াতের

টুইট প্রতিবেদক: মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফনের জন্য তিন নারীর কবর খোঁড়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে কবর খোঁড়ার সময় তিন নারী একা ছিলেন না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গ্রাম পুলিশ। তাঁর দাবি, দুজন পুরুষও কবর খোঁড়ার কাজে অংশ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, মানিক পশারীর পরিবারের অভিযোগ, প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর সেটি ভরাট করে দেওয়া হয় এবং হুমকির কারণে অনেকে ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান।

প্রয়াত জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলার বাদী ছিলেন মানিক পশারী। তাঁর দাফন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে পিরোজপুরে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় গ্রাম পুলিশ মতিউর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে মানিক পশারীর বাড়ির কাছে প্রথমবার কবর খোঁড়া হয়। তবে মাগরিবের পর একদল লোক কবরটি ভরাট করে দেয়। পরে রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে পুনরায় কবর খোঁড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মতিউর রহমান জানান, কবর খোঁড়ার সরঞ্জাম আনতে তিনি মানিক পশারীর এক বোনের বাড়িতে যান। পরে ওই বোনসহ আরও দুই নারী ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি কবর খোঁড়ার জন্য লোক খুঁজতে গেলে নারীরা মাটি সরানোর কাজ শুরু করেন। এ সময় তিনি ও স্থানীয় আরেক ব্যক্তি কবর খোঁড়েন। ফলে তিন নারী একাই কবর খুঁড়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য সঠিক নয়।

পরিবারের অভিযোগ, ভয়ে সরে যান অনেকে

মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী বলেন, প্রথমবার কবর খোঁড়ার সময় পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় অন্য লোকজনও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর কবর ভরাট এবং হুমকির ঘটনার পর অনেকে ভয়ে সেখান থেকে চলে যান।

তাঁর অভিযোগ, জামায়াত-শিবিরের লোকজন এসে কবর ভরাট করে দেন। তাঁরা মানিক পশারীর বিরুদ্ধে সাঈদীর মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে কবর ভরাট করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
হেনা পশারী জানান, তাঁর ভাইয়ের ছোট মেয়ে ও তাঁরা দুই বোন মিলে কবর খোঁড়ার কাজে অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে আরও দুজন পুরুষ ছিলেন। পরে রাতে প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতিতে তাঁর ভাইকে দাফন করা হয়।

পুলিশ ও জামায়াতের বক্তব্য

পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতে মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে কবর ভরাট করে দেওয়া এবং দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের নেতারা। জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন বলে জানান। তবে দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়েও বিতর্ক

মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন দাবি করেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, সাঈদী মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরে ছিলেন না এবং তাঁকে রাজাকার বলা সঠিক নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আরেক মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় মানিক পশারী সাক্ষ্য দেওয়ার পর তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা করা হয়। তাঁর অভিযোগ, মানিক পশারীর কবর ভরাট করে দেওয়া এবং গার্ড অব অনারে বাধা দেওয়ার ঘটনা ওই বিরোধেরই অংশ।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। মানিক পশারী সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেভাবে মারা যান মানিক পশারী মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ে ও জামাতার বাড়িতে আশ্রয়ে ছিলেন। গত দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।

গত শনিবার সকালে টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ে-জামাতার বাড়িতে ৮৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। দুপুরে মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হয়। গার্ড অব অনার ও দাফন নিয়ে জটিলতার মধ্যে বিকেলে পুলিশ লাইনসে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।পরে রাত ১টার দিকে মরদেহ নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়। রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে তিন গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয় দুই ব্যক্তির সহায়তায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয় বলে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ জানিয়েছেন।

ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও বক্তব্যের পাশাপাশি পরিবার, প্রশাসন, জামায়াতের নেতা এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে এসেছে। কবর ভরাটের অভিযোগ ও মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে ওঠা বিতর্কের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রামাণ্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।