সাজেকে আতঙ্ক, বান্দরবানে পর্যটকের ঢল

সন্ত্রাসী হামলার পর সাজেক থেকে পর্যটকদের আগমন, হোটেল-মোটেল হাউসফুল; আবাসন ও পরিবহন সংকটে ভোগান্তি
বান্দরবান প্রতিনিধি:টানা ছুটি, পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় আর সাজেকে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার প্রভাবে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে পাহাড়ি জেলা বান্দরবান। সাজেকে হামলার পর নিরাপত্তার কারণে সেখান থেকে কয়েক হাজার পর্যটক বান্দরবানে চলে এসেছেন বলে জানা গেছে। এতে জেলার পর্যটনকেন্দ্র, হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও পরিবহনকেন্দ্রগুলোতে দেখা দিয়েছে ব্যাপক চাপ। অধিকাংশ আবাসিক প্রতিষ্ঠানের কক্ষ আগেই বুক হয়ে যাওয়ায় আবাসনসংকটে পড়েছেন অনেক পর্যটক।
সাজেক থেকে বান্দরবানে পর্যটকদের ঢল
বগুড়া থেকে আসা পর্যটক দম্পতি আদ্র ও অদিতি বুধবার সাজেকে বেড়াতে যান। বৃহস্পতিবার সেখানে হামলার ঘটনার পর তাঁরা আটকা পড়েন। পরে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় সাজেক থেকে বেরিয়ে বান্দরবানে চলে আসেন।
বান্দরবানের নীলাচলে তাঁদের সঙ্গে কথা হলে দম্পতি জানান, সাজেকে তাঁরা আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। বান্দরবানে এসে স্বস্তি পেয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, এখানকার পরিবেশ অনেক শান্তিপূর্ণ।
এই দম্পতির মতো সাজেক থেকে আসা আরও বহু পর্যটকের আগমনে বান্দরবানের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভিড় বেড়েছে।
হোটেল-মোটেলে কক্ষ নেই, ভোগান্তিতে পর্যটক
জেলা হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান শহর ও আশপাশের শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের প্রায় সব কক্ষই বুক হয়ে গেছে। আগাম বুকিং ছাড়া আসা পর্যটকদের অনেকেই আবাসন পাচ্ছেন না।
সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, শহরের শতাধিক হোটেল-মোটেলে কোনো কক্ষ খালি নেই বললেই চলে। আগাম বুকিং ছাড়া আসা পর্যটকদের পাশাপাশি সাজেক থেকে আসা মানুষের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
মেঘলা পর্যটন মোটেলের ব্যবস্থাপক মো. শোয়েব জানান, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁদের কোনো কক্ষ খালি নেই। প্রতিদিনই কক্ষ না পেয়ে পর্যটকদের ফিরে যেতে হচ্ছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দিন জানান, বান্দরবান জেলা শহরসহ রুমা, থানচি, আলীকদম ও লামা উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫০টি হোটেল-মোটেলে একসঙ্গে ২৬ হাজার থেকে ৩০ হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। চলতি ছুটিতে এসব আবাসনপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সব কক্ষই পূর্ণ হয়ে গেছে।
পর্যটনকেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড়
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল থেকেই বান্দরবানের নীলাচল, মেঘলা, চিম্বুক, নীলগিরি, প্রান্তিক লেক, দেবতাকুম, থানচি ও রুমাসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় দেখা যায়।
পর্যটকদের চাপ বেড়েছে চাঁদের গাড়ির স্টেশনগুলোতেও। গাড়ির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে অনেককে।
চাঁদের গাড়ির লাইনম্যান ফখরুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০টি চাঁদের গাড়ি বিভিন্ন পর্যটনগন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে। গন্তব্য ও দূরত্বভেদে এসব গাড়ির ভাড়া চার হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে যানবাহনের সংকট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় সতর্ক প্রশাসন
পর্যটকদের চাপ সামলাতে এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে বাড়তি তৎপরতা চালাতে হচ্ছে।
পুলিশ সুপার ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, পর্যটকদের ভ্রমণ নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্র ও পাহাড়ি সড়কে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. এস এম হাসান জানান, পর্যটকেরা যাতে কোনো সমস্যায় না পড়েন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যাঁরা আবাসন পাচ্ছেন না, তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
পর্যটন ঘিরে কোটি টাকার লেনদেনের আশা
পর্যটকদের ব্যাপক আগমনে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার আশা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাঁদের ধারণা, টানা ছুটিতে আবাসন, পরিবহন, খাবার, প্রবেশমূল্য ও স্থানীয় পণ্য কেনাবেচা মিলিয়ে জেলায় আট থেকে ১০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হতে পারে।
শুধু পর্যটক পরিবহন খাত থেকেই ৯০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে স্থানীয় গাইড, নৌকার মাঝি, পরিবহনশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পাহাড়ি পাড়ার কটেজমালিকেরা উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সামনে প্রবারণা উৎসব, বাড়তে পারে পর্যটকের চাপ
এরই মধ্যে আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে রথযাত্রা উৎসব শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটি, লক্ষ্মীপূজা ও প্রবারণা উৎসবকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সব মিলিয়ে বর্তমানে উৎসবমুখর বান্দরবান। তবে পর্যটকদের ব্যাপক আগমনে আবাসন ও পরিবহনসংকট, ভাড়া নিয়ে অভিযোগ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার চাপও বেড়েছে। পর্যটন খাতে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপদ ভ্রমণ ও ভোগান্তি কমাতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।






