মিষ্টির পর ইশরাক, বিএনপিতে শৃঙ্খলার প্রশ্ন

উপপ্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ ঘির দলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, কঠোর সিদ্ধান্তে নেতৃত্বের বার্তা নাকি বাড়ছে অসন্তোষ।
টুইট প্রতিবেদক বিএনপির দুই নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং পরবর্তী সাংগঠনিক পদক্ষেপ ঘিরে দলটির অভ্যন্তরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও দখলের চেষ্টার ঘটনায় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের পর এবার অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ ছেড়েছেন ইশরাক হোসেন।
অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই নেতার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপকে কেউ দলের শৃঙ্খলা রক্ষায় নেতৃত্বের কঠোর অবস্থান হিসেবে দেখছেন। আবার বিএনপির কয়েকজন নেতার মতে, ইশরাকের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি অতিরিক্ত কঠোর হয়েছে। ফলে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
দুই ঘটনায় পদত্যাগ, আলোচনায় দলীয় শৃঙ্খলা
গত ১ অক্টোবর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও দখলের চেষ্টার ঘটনায় আলোচনায় আসেন বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ওই ঘটনার পর তিনি পদত্যাগ করেন। এর আগে সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক কমিটির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয় দলটি।
এর ১৮ দিনের মাথায় ভিন্ন একটি ঘটনায় প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন ইশরাক হোসেন। গত শনিবার রাজধানীর গেণ্ডারিয়ায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিতর্ক শুরু হয়।
সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। ইশরাকের ভাষ্য, বিএনপি ও সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করা এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজ আড়ালে পড়ে যাওয়া ঠেকাতেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে পদত্যাগ করলেও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য পদ এবং দলীয় দায়িত্ব বহাল রয়েছে তাঁর।
সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপির ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ইশরাকের পদত্যাগ নিয়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে। কেউ মনে করছেন, একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলা গ্রহণযোগ্য নয়। আবার কারও মতে, সরাসরি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত না নিয়ে তাঁকে সতর্ক করা যেত।
দলটির কয়েকজন নেতার ধারণা, ইশরাকের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অন্যান্য বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত সবার বিরুদ্ধে একই ধরনের পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এতে দলীয় সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, কোনো ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে নেতৃত্বকে অবস্থান নিতেই হয়। তাঁর মতে, মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ।
অস্ত্র হাতে অভিযান নিয়ে প্রশ্ন
ইশরাকের পদত্যাগের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে তাঁর অভিযানে অংশ নেওয়ার ধরন। মাদকবিরোধী কার্যক্রমের উদ্দেশ্য নিয়ে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়া কতটা যথাযথ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার মতে, ইশরাক কার পরামর্শে ওই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
অন্যদিকে ইশরাকের ঘনিষ্ঠদের দাবি, মাদকবিরোধী অভিযানটি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল এবং তাঁর কর্মসূচির ভিডিও নিয়মিতভাবে ধারণ করা হয়। তবে অভিযানটির ধরন ও অস্ত্র প্রদর্শনের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেছে।
কঠোর অবস্থান কি অন্যদের জন্যও প্রযোজ্য হবে?
গত কয়েক বছরে বিএনপি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। সরকার গঠনের পরও চাঁদাবাজি, দখল এবং অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নাম আলোচনায় এসেছে।
মিরপুরের ঘটনায় সাংগঠনিক কমিটি বিলুপ্তি ও নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর মিষ্টির পদত্যাগ এবং ইশরাকের প্রতিমন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘটনা নেতৃত্বের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিএনপির কয়েকজন নেতার মতে, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে যে ধারণা রয়েছে, তা অন্য নেতাদের কাছে পুরোপুরি নাও থাকতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট ঘটনায় কেন কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার ব্যাখ্যা নেতৃত্বের কাছ থেকেই আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের চোখে নেতৃত্বের কৌশল
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনা দিয়ে বিএনপি দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়ে সামগ্রিকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তাঁর মতে, জনমনে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়ার লক্ষ্যেও এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে বিশ্লেষক আসিফ শাহান মনে করেন, এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের কাছে একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে—বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পরিণতি হতে পারে। তাঁর মতে, দলের ভেতরে শৃঙ্খলা ও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্বের এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুশতাক হোসেনের মতে, বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নেতৃত্বের কঠোর অবস্থান কার্যকর হলে তা দলের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বিএনপির নেতৃত্বের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কার্যকর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়া। দ্বিতীয়ত, অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের আস্থা বজায় রাখা।
ইশরাকের পদত্যাগে তাৎক্ষণিকভাবে নেতৃত্বের কঠোর অবস্থানের বার্তা গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব নির্ভর করবে পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোর ওপর। একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত অন্য নেতাদের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেটিই হবে দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কার্যকারিতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।






