ট্রাম্পের কঠোর বার্তা, যুদ্ধ থামাতে জেলেনস্কিকে চুক্তির চাপ

ইউক্রেনকে যুদ্ধ মীমাংসা করতে হবে’—মার্কিন সহায়তার বিপরীতে কিছুই না পাওয়ার অভিযোগ ট্রাম্পের; রাশিয়ার প্রতি নমনীয় অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটন-কিয়েভ সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় বসে চুক্তি করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর আবারও চাপ সৃষ্টি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ অবসানে জেলেনস্কিকে উদ্যোগী হতে হবে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট সমঝোতায় আগ্রহী না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
একই সঙ্গে ইউক্রেনকে শত শত বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র এর বিনিময়ে কিছুই পায়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর ২০২৬) প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং রাশিয়ার প্রতি তাঁর তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যকার সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। এর মধ্যেই নরওয়ের রাজধানী অসলোতে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জেলেনস্কি। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক মেরামত এবং যুদ্ধ অবসানের পথ খুঁজে বের করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
জেলেনস্কিকে আলোচনায় বসার আহ্বান ট্রাম্পের
হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনকে অবশ্যই যুদ্ধের সমাধান চাইতে হবে এবং জেলেনস্কিকেও এ বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে।
ট্রাম্পের ভাষায়, “ইউক্রেনকে এই যুদ্ধ মীমাংসা করতে চাইতে হবে।
জেলেনস্কিকে এই যুদ্ধ মীমাংসা করতে চাইতে হবে। আর যদি তিনি তা না চান, তাহলে আমার মনে হয় এটি খুবই খারাপ কিছু হতে চলেছে।
ইউক্রেনকে দেওয়া মার্কিন সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে ট্রাম্প আরও বলেন, “আমরা কিছুই পাইনি, শুধু উচ্চ ডিজেলের দাম ছাড়া। তাঁর দাবি, বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সম্ভবত প্রায় যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি অর্থ দিয়েছে, যার পরিমাণ শত শত বিলিয়ন ডলার।
ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সহায়তার পরও যুদ্ধ শেষ না হওয়ায় ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তিনি মনে করেন, জেলেনস্কি আগে তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করলে যুদ্ধ অনেক আগেই থামানো সম্ভব হতো।
একই সঙ্গে তিনি ইউক্রেনের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার কথাও বলেছে।
রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে মস্কোর ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, “রাশিয়া আসলে ইউক্রেনের বিষয়ে ঠিকই আছে। তারা খুব বেশি কিছু করছে না।
রাশিয়ার প্রতি এমন মন্তব্যের পাশাপাশি জেলেনস্কির সমালোচনা এবং ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের ইঙ্গিত দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করেছে। ট্রাম্প এর আগে জেলেনস্কিকে যুদ্ধ অবসানে যথেষ্ট উদ্যোগী না হওয়ার অভিযোগে সমালোচনা করেছেন। ইউক্রেনের জন্য নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল, ডিজেলের দাম নিয়ে বিতর্ক
ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে অবনতির অন্যতম কারণ রাশিয়ার জ্বালানি খাত নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ। মার্কিন জ্বালানির দাম কমানোর যুক্তিতে ট্রাম্প রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিসংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন এবং রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ স্থগিত রেখেছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি এসব হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক আন্তর্জাতিক কারণ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির জন্য শুধু ইউক্রেনের হামলাকে দায়ী করা ট্রাম্পের বক্তব্যের একটি অংশ; এটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য বলে বিবেচনা করা যায় না।
জেলেনস্কির পাল্টা অভিযোগ
ট্রাম্পের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি। তাঁর বক্তব্য, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলে মস্কো জ্বালানি বিক্রি থেকে আয় করতে পারবে এবং সেই অর্থ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
জেলেনস্কির অবস্থান অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে সাড়া দিয়েছে, কিন্তু রাশিয়ার পক্ষ থেকে একই ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তা এবং স্টারলিংক/স্টারশিল্ড স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের বিষয়েও সহায়তা চেয়েছেন।
কিয়েভের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম তথ্য সরবরাহ এবং ইউক্রেনীয় ড্রোন পরিচালনায় ব্যবহৃত স্যাটেলাইট যোগাযোগের ক্ষেত্রে মার্কিন সহায়তা সীমিত হয়েছে। ইউরোপীয় মিত্রদের অর্থায়নে কেনা কিছু আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহ কার্যক্রমের প্রকৃত পরিস্থিতি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অসলোতে উইটকফের সঙ্গে বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা হিসেবে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) নরওয়ের অসলোতে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করেন জেলেনস্কি। বৈঠকটি নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের নেতৃত্বের উদ্যোগে আয়োজিত কূটনৈতিক আলোচনার অংশ।
এ আলোচনায় নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরে এবং ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টাবেরও অংশ নেওয়ার কথা জানানো হয়। ট্রাম্পের জামাতা ও আলোচনাসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি জ্যারেড কুশনার দূর থেকে আলোচনায় যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।
বৈঠকের লক্ষ্য ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও কার্যকর করা এবং ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব কমানোর পথ খোঁজা।
ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, যুদ্ধবিরতির সম্ভাব্য কাঠামো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার বিষয়গুলো এ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
যুদ্ধের ময়দানে বাড়ছে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা
কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। দুই পক্ষই পরস্পরের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় রুশ হামলা এবং রাশিয়ার তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও জ্বালানিসংক্রান্ত চাপ আরও বাড়াচ্ছে।
শীতকাল ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্প উৎপাদন এবং জরুরি পরিষেবায় বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং উভয় পক্ষের হামলা বন্ধের বিষয়ে কার্যকর সমঝোতা অর্জন করা আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামনে কী
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে আরও দৃশ্যমান উদ্যোগ এবং আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি চান। একই সঙ্গে মার্কিন সহায়তার ব্যয় নিয়ে তাঁর অসন্তোষ এবং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের জন্য নতুন কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে জেলেনস্কির অবস্থান হলো, যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগের পাশাপাশি ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং রাশিয়াকেও যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে।
অসলোতে উইটকফের সঙ্গে বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ক মেরামত ও যুদ্ধ অবসানের নতুন পথ তৈরিতে কতটা কার্যকর হয়, তা পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপে বোঝা যাবে। তবে শুধু ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেই যুদ্ধের সমাধান হবে কি না, তা নির্ভর করবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থান, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য চুক্তির শর্তগুলোর ওপর।






