৪২ বছর পর জেলেপল্লির পূজামণ্ডপে জেলা প্রশাসক

প্রান্তিক জেলে সম্প্রদায়ের দুর্গোৎসবে যোগ দিয়ে নিরাপত্তার আশ্বাস, নারীদের মধ্যে শাড়ি বিতরণ; চট্টগ্রামে ২ হাজার ৫৯৩টি মণ্ডপে পূজা উদযাপন।

টুইট প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার প্রত্যন্ত জেলেপল্লি পশ্চিম চাম্বলের বাংলাবাজার সর্বজনীন বুড়া কালী মন্দিরে ৪২ বছর পর প্রথমবারের মতো কোনো জেলা প্রশাসক দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন।

রোববার (১৮ অক্টোবর) মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উপস্থিতিতে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহ দেখা যায়।১৯৮৪ সালে মন্দিরটিতে দুর্গাপূজা শুরু হয়।

আয়োজকদের দাবি, দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময়ে কোনো জেলা প্রশাসক এই প্রত্যন্ত জেলেপল্লির পূজামণ্ডপে আসেননি। এবার জেলা প্রশাসকের আগমনকে তাঁরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি প্রশাসনের বিশেষ মনোযোগের প্রতীক হিসেবে দেখছেন।

জেলেপল্লির মানুষের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি

মন্দির পরিদর্শনের সময় জেলা প্রশাসক আয়োজক ও স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। পূজার আয়োজন ঘুরে দেখার পাশাপাশি নারী পুণ্যার্থীদের হাতে শাড়ি তুলে দেন। একই সঙ্গে নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসব উদযাপনে প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তার আশ্বাস দেন।

মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি গুরুধন দাশ বলেন, দরিদ্রপীড়িত এই জেলেপল্লিতে জেলা প্রশাসককে পেয়ে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত। তাঁর আশ্বাসে উৎসব উদযাপন নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে।

কমিটির সাধারণ সম্পাদক রতন দাশ জানান, প্রত্যন্ত এই এলাকায় জেলা প্রশাসক দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানাতে আসবেন, তা তাঁরা কল্পনাও করেননি। ১৯৮৪ সালে মন্দিরে পূজা শুরু হওয়ার পর এই প্রথম কোনো জেলা প্রশাসক এখানে এসেছেন।

সব সম্প্রদায়ের সমান অংশগ্রহণের বার্তা

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রথম দুর্গাপূজা। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ যেন সমানভাবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষকে সরকার পাশে থাকার বার্তা দিতে চায়। জেলে সম্প্রদায়ের মানুষও যেন আনন্দ ও নির্বিঘ্নে ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই প্রশাসনের এই উদ্যোগ।

পূজামণ্ডপের আয়োজনের প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক বলেন, উৎসবের ক্ষেত্রে জায়গার আকার বড় বিষয় নয়। বরং সব মানুষ একত্র হয়ে আনন্দ করতে পারছেন কি না এবং নিজেদের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও রীতিনীতি পালন করতে পারছেন কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

অতীতের হামলার ঘটনায় নিরাপত্তায় বাড়তি সতর্কতা

পশ্চিম চাম্বল এলাকায় অতীতে পূজামণ্ডপে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাবাজার জলদাসপাড়ার পূজামণ্ডপে হামলার পাশাপাশি বাঁশখালীর ১৫টি মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এর মধ্যে একটি মন্দিরের প্রতিমা এবং ১৪টি মন্দিরের তোরণ ভাঙচুর করা হয়েছিল। সংঘর্ষে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ৩০ থেকে ৩৫ জন আহত হন।

এসব ঘটনায় পুলিশ তিনটি মামলা করে। মামলাগুলোতে এজাহারভুক্ত ৬২ জনসহ আরও অনেক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ২১ জনকে।

এবারের দুর্গাপূজায় যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। উৎসবের আনন্দ বিঘ্নিত করার যেকোনো অপচেষ্টা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি আনসার ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।

বাঁশখালীর চারটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন

মহাসপ্তমীতে জেলা প্রশাসক বাঁশখালীর চারটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এগুলো হলো পশ্চিম চাম্বল বাংলাবাজার সর্বজনীন বুড়া কালী মন্দির, শ্রীশ্রী অদ্বৈতানন্দ ঋষিমঠ ও মিশন সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপ, সাধনপুর পল্লীমঙ্গল সমিতি মণ্ডপ এবং বাণীগ্রাম জগন্নাথধাম সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপ।

পরিদর্শনকালে তিনি মণ্ডপগুলোর সাজসজ্জা ও আয়োজনের প্রশংসা করেন। নারী পুণ্যার্থীদের মধ্যে শাড়ি বিতরণের পাশাপাশি দুটি মণ্ডপকে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসক জানান, এবার চট্টগ্রামে প্রায় ৪০০টি পূজামণ্ডপ বেড়েছে। জেলায় মোট প্রায় ২ হাজার ৫৯৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা ও জিআর চালের বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপের খোঁজখবর রাখতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

জেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন জানান, মণ্ডপের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। প্রান্তিক এলাকার মণ্ডপগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। দুর্গোৎসব শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বহাল থাকবে।

সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখার আহ্বান

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হিসেবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও দেশের মানুষের পারস্পরিক বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় রীতিনীতি রয়েছে। এসব স্বকীয়তা বজায় রেখেই সবাইকে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ‘রেইনবো নেশন’ ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। দুর্গাপূজার আনন্দ ভাগাভাগি করতে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম সফরে আসবেন বলেও জানান তিনি।

পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান, জেলা আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন, বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামজীদুর রহমান তন্ময় এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা।

প্রত্যন্ত জেলেপল্লির এই পূজামণ্ডপে জেলা প্রশাসকের উপস্থিতি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন নয়, বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উৎসবের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরেছে। অতীতের সহিংসতার অভিজ্ঞতার পর এবার দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসনের তৎপরতা স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।