ওষুধ কারখানায় আগুন: নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন

টঙ্গীর অগ্নিকাণ্ডে রাসায়নিক ঝুঁকি, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, উদ্ধারকর্মীদের সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাইয়ের আহ্বান বিশেষজ্ঞের।

টুইট প্রতিবেদক: ওষুধ কারখানায় অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা নয়; এটি শ্রমিকদের নিরাপত্তা, উদ্ধারকর্মীদের সুরক্ষা, পরিবেশের ঝুঁকি এবং সরকারি তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, রাসায়নিকের মজুত ও ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

গত ১৪ অক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগ আলীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট কাজ করে। উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশও সহায়তা করে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবনের ভেতরে থাকা রাসায়নিক এবং অ্যালুমিনিয়াম শিটের নিচে ব্যবহৃত দাহ্য রাবার আগুনের তীব্রতা বাড়িয়ে থাকতে পারে।

অভিযানের সময় তীব্র ধোঁয়া ও গন্ধের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। এক ফায়ার সার্ভিস কর্মীকে শ্বাসকষ্টের জন্য চিকিৎসা নিতে হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর রাসায়নিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষায়িত দলও সহায়তা করে।

তবে তীব্র বা ক্লোরিনের মতো গন্ধ পাওয়া গেলেই কোনো নির্দিষ্ট রাসায়নিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন।

আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ জরুরি

কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বক্তব্যে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ তখনো নির্ধারণ করা যায়নি।

ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া সমীচীন নয়। আগুনের উৎপত্তিস্থল, বৈদ্যুতিক তার ও বিতরণ বোর্ডের অবস্থা, সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আগুন ভবনের চতুর্থ তলায় শুরু হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। আগুনের সূচনাস্থল নিয়ে ভিন্ন কোনো দাবি থাকলে তা ভবনের নকশা, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

আগুন ছড়িয়ে পড়ার কারণও খতিয়ে দেখতে হবে
একটি নির্দিষ্ট স্থানে আগুনের সূত্রপাত হলেও দাহ্য আবরণ, অপর্যাপ্ত অগ্নিপ্রতিরোধী দেয়াল ও দরজা, খোলা সিঁড়ি, বিভিন্ন সেবা-সংযোগের ফাঁকা পথ কিংবা ভবনের দুটি অংশের সংযোগস্থল দিয়ে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ভবনের বাইরের অংশে অ্যালুমিনিয়াম শিট বা প্যানেল থাকলেই সেটিকে অগ্নিনিরাপদ বলা যায় না। কিছু অ্যালুমিনিয়াম-সংযুক্ত প্যানেলের ভেতরে দাহ্য উপাদান থাকতে পারে। তবে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের ভবনে ঠিক কী ধরনের উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছিল, তা পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

এ ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তার সক্রিয় ও স্থায়ী, দুই ধরনের ব্যবস্থাই যাচাই করা জরুরি। অগ্নিসংকেত, ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ পানির পাম্প ও সরবরাহব্যবস্থা সক্রিয় ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, অগ্নিপ্রতিরোধী দরজা-দেয়াল, নিরাপদ সিঁড়িঘর এবং পাইপ ও বৈদ্যুতিক তারের প্রবেশপথ যথাযথভাবে বন্ধ রাখার ব্যবস্থা আগুনের বিস্তার ঠেকাতে সহায়তা করে।

ভবনের নকশায় এসব ব্যবস্থা ছিল কি না, বাস্তবে স্থাপন করা হয়েছিল কি না, নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়েছে কি না এবং অগ্নিকাণ্ডের সময় সেগুলো কার্যকর ছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর নথিপত্র, সরেজমিন পরীক্ষা ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে।

রাসায়নিক ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি কতটা ছিল?
ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের উপস্থিতি থাকলে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ঘটনাস্থল পরিচালনার দায়িত্ব, উদ্ধারকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ, ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ এবং নিরাপদ প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অগ্নিকাণ্ডের সময় বিপজ্জনক এলাকা, নিয়ন্ত্রিত মধ্যবর্তী এলাকা এবং নিরাপদ কমান্ড ও চিকিৎসা এলাকা যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে প্রবেশকারী কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী সম্ভাব্য রাসায়নিক ঝুঁকির উপযোগী ছিল কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।

সাধারণ অগ্নিনির্বাপণ পোশাক সব ধরনের রাসায়নিক থেকে সুরক্ষা দেয় না। কোন ধরনের সুরক্ষাসামগ্রী প্রয়োজন, তা নির্ভর করে রাসায়নিকের প্রকৃতি, সংস্পর্শের ধরন ও ঝুঁকির মাত্রার ওপর।

এ কারণে ফায়ার সার্ভিসের বিশেষায়িত রাসায়নিক ঝুঁকি মোকাবিলা দলের প্রশিক্ষণ, রাসায়নিক শনাক্তকরণ সরঞ্জাম, শ্বাস-প্রশ্বাসের সুরক্ষাব্যবস্থা, দূষণমুক্ত করার সুবিধা এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সক্ষমতা মূল্যায়ন করা জরুরি।

উদ্ধারকাজে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কোন সংস্থা কী দায়িত্ব পালন করেছে এবং কী ধরনের সুরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে, এসব তথ্য অভিযান-সংক্রান্ত নথি, যোগাযোগের রেকর্ড ও সরঞ্জাম পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা যেতে পারে।

লাইসেন্স ও পরিদর্শনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

শিল্পকারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক সরকারি সংস্থার দায়িত্ব থাকতে পারে। তবে সব সংস্থার দায়িত্ব এক নয়। কোন সংস্থা কী ধরনের অনুমোদন দিয়েছে, কী ঝুঁকি যাচাই করেছে, সরেজমিন পরিদর্শনে কী পেয়েছে এবং কোনো ঘাটতি শনাক্ত হলে তা সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না, এসব তথ্য স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কারখানাটির অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র, ভবনের নকশা, রাসায়নিক সংরক্ষণের অনুমতি এবং নিয়মিত পরিদর্শনের নথি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

তদন্তে কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে প্রমাণের ভিত্তিতে দায়িত্ব নির্ধারণ না করে আগাম কাউকে দায়ী করা ন্যায়সংগত হবে না।

আগুন নেভানোর পরও ঝুঁকি থাকতে পারে

অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আসার পরও সম্ভাব্য পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যেতে পারে। ছাই, ধোঁয়ার অবশিষ্টাংশ, দূষিত নির্বাপণ-পানি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত রাসায়নিকের পাত্র থেকে দূষণের আশঙ্কা রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ধোঁয়া বা রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা শ্রমিক ও উদ্ধারকর্মীদের পরিচয়, সংস্পর্শের সময়কাল এবং উপসর্গের তথ্য নথিবদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরবর্তী পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

নিরাপত্তায় বিনিয়োগই দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা

অগ্নিনিরাপত্তার জন্য ব্যয়কে অনেক সময় অতিরিক্ত খরচ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বড় অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার অভিযান, চিকিৎসা, পরিবেশ পুনরুদ্ধার, উৎপাদন বন্ধ থাকা এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের ব্যয় অনেক বেশি হতে পারে।

শিল্পকারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী বিনিয়োগ, নিয়মিত পরিদর্শন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মহড়া প্রয়োজন। এতে শুধু প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নয়, শ্রমিকদের জীবন, পরিবেশ এবং দেশের শিল্প খাতের ওপর মানুষের আস্থাও সুরক্ষিত থাকে।

ওষুধ মানুষের জীবন বাঁচায়। সেই ওষুধ তৈরির কারখানায় কর্মরত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। টঙ্গীর অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব মূল্যায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।