ঋতুপর্ণাদের ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি

সাফের অভিযোগের তিন মাস পরও অ্যালকোহল বহনের প্রমাণ পায়নি তদন্ত কমিটি; দেরিতে তদন্ত ও সদস্য পরিবর্তন নিয়ে উঠেছে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন।

টুইট প্রতিবেদক: ভারতের গোয়ায় নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের ম্যানেজার খালিদ মাহমুদ নওমির বিরুদ্ধে হোটেলে অ্যালকোহল বহনের অভিযোগের কোনো উপযুক্ত প্রমাণ পায়নি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) তদন্ত কমিটি। তবে সাফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর উচ্চবাচ্যের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে। তিন মাস পরও অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না মেলায় তদন্তের গতি, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাফুফের নির্বাহী সদস্য ও তদন্ত কমিটির প্রধান কামরুল ইসলাম হিলটন জানিয়েছেন, সাফের চিঠির ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে অ্যালকোহল বহনের অভিযোগের পক্ষে যথাযথ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, খালিদ মাহমুদ দলের কক্ষ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত সুবিধা নিয়ে সাফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেছিলেন। এ ঘটনায় সাফও বাফুফেকে চিঠি দিয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে আচরণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার সুপারিশ থাকতে পারে।

সুনির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করেও মেলেনি প্রমাণ

গত ২৬ মে বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষারের কাছে পাঠানো চিঠিতে সাফ অভিযোগ করেছিল, ২৩ মে ভারতীয় সময় বিকেল ৫টা ৫৬ মিনিটে খালিদ মাহমুদ চারটি অ্যালকোহলের বোতল বহন করে হোটেলে নিয়ে যান। হোটেলের বাইরে থেকে অ্যালকোহল আনার নিয়ম না থাকায় এ নিয়ে হোটেলকর্মীদের সঙ্গে তাঁর বাকবিতণ্ডা হয় বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।

অভিযোগের সময় ও ঘটনার বিবরণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকার পরও তদন্ত কমিটি কেন প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত কমিটির প্রধান জানিয়েছেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ চাওয়া হলেও এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় হোটেল কর্তৃপক্ষ তা সরবরাহ করতে পারেনি।

তদন্তের বিলম্বের ব্যাখ্যায় হিলটন বলেছেন, কমিটি গঠনের পর বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে তাঁকে কয়েক সপ্তাহ যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে হয়েছিল। এ ছাড়া ফেডারেশনের অন্যান্য কাজেও সময় দিতে হয়েছে।

তবে অভিযোগের প্রায় তিন মাস পর তদন্ত শেষ করার উদ্যোগ এবং ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা নিয়ে ফুটবলসংশ্লিষ্ট মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনেক হোটেল নির্দিষ্ট সময় পর ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষণ করে না,এমন বাস্তবতায় যথাসময়ে প্রমাণ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তদন্ত কমিটির সদস্য পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন

তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের আরেকটি কারণ কমিটির সদস্য পরিবর্তন। বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব আতিকুর রহমানকে মাঝপথে তদন্ত কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে নারী ফুটবলারদের সঙ্গে কোচ পিটার বাটলারের বিরোধ নিয়ে তদন্তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

নারী দলের ম্যানেজারকে ঘিরে অভিযোগের তদন্ত কমিটির প্রথম সভায় আতিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় সফরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা, হোটেলের ভিডিও ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাক্ষ্য সংগ্রহসহ কয়েকটি বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তদন্ত কমিটির প্রধান। ফলে অভিযোগের যথাযথ অনুসন্ধান হয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সাফের অবস্থান কী

সাফের সাধারণ সম্পাদক পুরুষোত্তম ক্যাটেল জানিয়েছেন, হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি বাফুফেকে জানানো হয়েছিল। এ ঘটনায় সাফ কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি এবং নেওয়ার পরিকল্পনাও নেই। তাঁর ভাষ্য, বিষয়টি বাফুফের এখতিয়ারভুক্ত।

তদন্ত কমিটি সাফের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে হিলটন বলেন, সাফের পাঠানো চিঠি পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে তাদের কাছে আলাদাভাবে কোনো প্রশ্ন করা হয়নি। প্রয়োজন হলে তদন্ত প্রতিবেদন সাফকে দেওয়া যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ছিল, অন্য দলের সদস্যদের কাছেও অ্যালকোহল ছিল। তাহলে শুধু বাংলাদেশ দলকে নিয়ে অভিযোগ জানানো হলো কেন?এমন প্রশ্নের জবাবে সাফের সাধারণ সম্পাদক বলেন, অন্য কোনো দলের বিষয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে প্রতিবেদন দেয়নি। বাংলাদেশ দলের ম্যানেজারকে নিয়ে প্রতিবেদন পাওয়ায় সেটিই বাফুফেকে জানানো হয়েছে।

সিদ্ধান্তের চেয়ে তদন্তপ্রক্রিয়াই এখন বড় প্রশ্ন
অ্যালকোহল বহনের অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়া মানেই অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। একইভাবে, অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করার জন্যও যথাযথ প্রমাণ প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে সময়মতো ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ না করা, অভিযোগকারী পক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত যোগাযোগ না করা এবং তদন্ত কমিটির সদস্য পরিবর্তনের কারণ স্পষ্ট না হওয়া, সব মিলিয়ে তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর বাফুফে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে নারী ফুটবলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের বিষয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ, সময়োপযোগী ও প্রমাণনির্ভর তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।

অন্যথায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের পাশাপাশি দেশের ফুটবল প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়েও সংশয় থেকে যাবে।