বিশ্বকাপে বিদ্বেষের শীর্ষে আর্জেন্টিনা

ফিফার গবেষণায় উঠে এসেছে অনলাইন হয়রানির ভয়াবহ চিত্র; ৮১২ খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তা আক্রান্ত, সবচেয়ে বেশি ছিল বর্ণবাদী আক্রমণ।

টুইট প্রতিবেদক: ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে অনলাইনে সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষমূলক আক্রমণের শিকার হয়েছে আর্জেন্টিনা। দেশটির জাতীয় দলকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে অসংখ্য ঘৃণামূলক মন্তব্য। এ তালিকায় আর্জেন্টিনার পর রয়েছে ইংল্যান্ড, স্পেন, ব্রাজিল ও নরওয়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার এক গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত গবেষণাটি পরিচালনা করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সুরক্ষা পরিষেবা। ২০২৬ সালের ৯ জুন থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও টিকটকে প্রকাশিত ১ কোটি ৭১ লাখের বেশি পোস্ট ও মন্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

আর্জেন্টিনাকে ঘিরে অভিযোগ ও বিদ্বেষ
গবেষণা অনুযায়ী, আর্জেন্টিনাকে লক্ষ্য করে প্রকাশিত বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের বড় অংশজুড়ে ছিল দলটির কোচ লিওনেল স্কালোনিকে ঘিরে সমালোচনা। অভিযোগ ছিল, রেফারিদের কাছ থেকে আর্জেন্টিনা অন্যায্য সুবিধা পেয়েছে। এসব মন্তব্যের মধ্যে বিদেশি-বিদ্বেষমূলক বক্তব্যও উল্লেখযোগ্য ছিল।

তবে ব্যক্তিগতভাবে অনলাইন আক্রমণের শিকার খেলোয়াড়দের তালিকায় আর্জেন্টিনার অবস্থান চতুর্থ। এ ক্ষেত্রে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও পর্তুগালের খেলোয়াড়েরা আরও বেশি আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক মন্তব্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল বর্ণবাদী আক্রমণ। বিশেষ করে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কয়েকজন খেলোয়াড়কে লক্ষ্য করে বর্ণবাদী বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে।

বর্ণবাদী আক্রমণে উদ্বেগজনক চিত্র

ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপে নজরদারির আওতায় থাকা ১ হাজার ৬০৬ জন খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তার অর্ধেকেরও বেশি অনলাইনে অপব্যবহার ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৮১২ জন অন্তত একটি আপত্তিকর বা হয়রানিমূলক বার্তা পেয়েছেন।

সব ধরনের বৈষম্যমূলক আক্রমণের মধ্যে বর্ণবাদ ছিল সবচেয়ে বেশি। বৈষম্যমূলক বার্তার ১২ শতাংশই ছিল বর্ণবাদী। অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি অনলাইন আক্রমণের শিকার ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ১০ হাজারেরও বেশি আপত্তিকর পোস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পোস্টের ৪০ শতাংশ ছিল বর্ণবাদী।

তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করেনি ফিফা। তাঁর বিরুদ্ধে বর্ণবাদ, সমকামিতাবিদ্বেষ, নারীবিদ্বেষ ও রূপান্তরকামী মানুষদের প্রতি বিদ্বেষমূলক আক্রমণের তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।

আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু রেফারিরাও

বিশ্বকাপে অনলাইন হয়রানির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিলেন ম্যাচ পরিচালনাকারী রেফারিরা। তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ম্যাচ পাতানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ চালানো হয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে হয়রানির চেষ্টা, যা ‘ডক্সিং’ নামে পরিচিত, তারও শিকার হয়েছেন তাঁরা।

অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে সাধারণ ধরনের অনলাইন

আক্রমণের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এসেছে ইউরোপ থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকা। অন্যদিকে, বর্ণবাদী বার্তা প্রকাশের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদেশি-বিদ্বেষমূলক আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। এসব মন্তব্যে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং জাতীয় দলে খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয় উঠে এসেছে।
লাখো মন্তব্য সরিয়ে দিয়েছে ফিফা

অনলাইন হয়রানি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে ফিফার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সুরক্ষা পরিষেবা বিপুলসংখ্যক পোস্ট ও মন্তব্য পর্যালোচনা করেছে। মোট ১ কোটি ৭১ লাখ পোস্ট ও মন্তব্য বিশ্লেষণের পর মানুষের মাধ্যমে যাচাই করে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার পোস্ট ও মন্তব্যকে আপত্তিকর হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২ হাজার ৯০৫টি অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে ৭৮৬টি অ্যাকাউন্টের তথ্য।

ফিফা ও এর সদস্য সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় প্রকাশিত ৬ কোটি ৭ লাখ মন্তব্যও পর্যবেক্ষণ করেছে সুরক্ষা পরিষেবার ব্যবস্থা। এর মধ্যে স্প্যামসহ ৯২ লাখ মন্তব্য আড়াল করা হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসরগুলোর একটি বিশ্বকাপকে ঘিরে এমন চিত্র অনলাইন নিরাপত্তা ও খেলোয়াড়দের মানসিক সুস্থতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ণবাদ ও বিদ্বেষে রূপ না নেয়, সে জন্য কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।