বিমানের বহরে আসছে ৩৫ নতুন উড়োজাহাজ

এয়ারবাসের সঙ্গে ১০ উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি, এর আগে বোয়িংয়ের সঙ্গে ২৫টির চুক্তি; বহর ৫০ ছাড়ানোর সম্ভাবনা

টুইট ডেস্ক: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর আধুনিকায়নে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এ বিমান সংস্থা। বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কুর্মিটোলার একটি হোটেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও এয়ারবাসের মধ্যে এ চুক্তি সই হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, এয়ারবাসের কাছ থেকে চারটি

এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ কিনবে বিমান। দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক পথে এ৩৫০-৯০০ এবং আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের পথে এ৩২১নিও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়

জানিয়েছে, এয়ারবাসের উড়োজাহাজ সরবরাহ ২০৩৩ সাল থেকে শুরু হতে পারে। পর্যায়ক্রমে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল নাগাদ সব উড়োজাহাজ বিমানের বহরে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে মোট কত অর্থ ব্যয় হবে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

যাত্রী বাড়লেও উড়োজাহাজের সংকট

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, দেশের আকাশপথের যাত্রীদের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বহন করছে। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রী বিদেশি ও অন্যান্য বিমান সংস্থার ওপর নির্ভর করেন।

বিমানের বহরে উড়োজাহাজের ঘাটতি থাকায় বাড়তে থাকা যাত্রীচাহিদার বড় অংশ নিজেদের মাধ্যমে পূরণ করা যাচ্ছে না। বহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে অন্তত অর্ধেক বাংলাদেশি যাত্রীকে নিজেদের উড়োজাহাজে বিদেশে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

মন্ত্রী বলেন, সঠিক পথে চলাচলের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বহর, অবকাঠামো ও সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। বিমানকে বিশ্বের অন্যতম সেরা বিমান সংস্থায় পরিণত করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ চলছে।

বোয়িংয়ের পর এয়ারবাস

এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তির আগে চলতি বছর দুই দফায় মার্কিন নির্মাতা বোয়িংয়ের কাছ থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান।
গত ৩০ এপ্রিল প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। এর মধ্যে আটটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ রয়েছে।
এরপর গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। এতে পাঁচটি ৭৮৭-১০ এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ সরবরাহ ২০৩১ সাল থেকে শুরু হতে পারে। সব উড়োজাহাজ পেতে ১১ থেকে ১২ বছর সময় লাগতে পারে।

বহর ৫০ ছাড়ানোর সম্ভাবনা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বর্তমান বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি বোয়িং এবং পাঁচটি ড্যাশ-৮। তবে দুটি উড়োজাহাজ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। অন্যগুলোরও একটি বড় অংশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বহর থেকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

এ অবস্থায় তাৎক্ষণিক চাহিদা সামাল দিতে আরও ১০টি উড়োজাহাজ ভাড়ায় নেওয়ার চেষ্টা করছে বিমান। তবে একাধিক উদ্যোগের পরও এখন পর্যন্ত নতুন কোনো উড়োজাহাজ ভাড়া নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এয়ারবাসের ১০টি এবং বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে নতুন উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৫। বর্তমান ১৯টি উড়োজাহাজের সঙ্গে এগুলো যোগ হলে ভবিষ্যতে বিমানের বহর ৫০টির বেশি উড়োজাহাজে দাঁড়াতে পারে।

প্রথমবার দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ

বিমানের বর্তমান বহরের বড় অংশই বোয়িংয়ের তৈরি। এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ নিয়ে বহর পরিচালনা করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

এয়ারবাসের এ৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দূরপাল্লার বাজারে নতুন পথ চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর এ৩২১নিও দিয়ে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক পথে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

শুধু উড়োজাহাজ কেনা নয়,পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বন্ধুদের খুশি করার জন্য নয়, দেশের বিমান পরিবহন খাতের প্রয়োজন বিবেচনা করেই এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। ব্যবসায়িক যৌক্তিকতা ও প্রয়োজন যেখানে থাকবে, সেখানেই সরকার চুক্তি করবে বলে জানান তিনি।

এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তির আওতায় উড়োজাহাজের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং প্রকৌশল সহায়তার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাও থাকবে। ফলে নতুন উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা তৈরির সুযোগও তৈরি হবে।

সরকার বাংলাদেশকে আঞ্চলিক আকাশপথের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও বড় ধরনের কারিগরি সংস্কারকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির কথাও জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের কাছ থেকে ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ বিমানের দীর্ঘমেয়াদি বহর পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এসব উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হতে কয়েক বছর সময় লাগবে।

ফলে বর্তমান বহরের সংকট সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদে ভাড়ায় উড়োজাহাজ সংগ্রহ এবং রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোই বিমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।